চীনের প্রভাব ঠেকাতে কোটি কোটি ডলারের কর্মসূচি ট্রাম্প প্রশাসনের

নজর এশিয়াতেও

চীনের প্রভাব ঠেকাতে কোটি কোটি ডলারের কর্মসূচি ট্রাম্প প্রশাসনের

ফন্ট সাইজ:

বিশ্বজুড়ে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় নতুন করে বড় ধরনের কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। গত বছর ব্যাপক বাজেট কাটছাঁটের কারণে স্থগিত হয়ে যাওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ পুনরায় চালু করার পাশাপাশি নতুন প্রকল্পেও শত শত কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে দেশটি।

এনিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যে মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছে, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও মধ্য আমেরিকার পুরোনো সমুদ্রতলের টেলিযোগাযোগ কেবল প্রতিস্থাপনে ১৭ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো, ওই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামোতে চীনের প্রভাব বিস্তার ঠেকানো।
বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বিনিয়োগ পশ্চিম গোলার্ধ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় চীনের কূটনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় বৃহত্তর মার্কিন কৌশলের অংশ।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চলতি বছরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে সম্ভাব্য বৈঠকের আগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে তুলনামূলক সহযোগিতামূলক মনোভাবের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এর মধ্যেই চীনের প্রভাব ঠেকাতে ওয়াশিংটনের এই নতুন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

সমুদ্রতলের কেবল প্রকল্পে জোর
ফার্স্ট পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেয়া অর্থায়নের প্রস্তাবে ‘ক্যারিবীয় ও মধ্য আমেরিকার সমুদ্রতলের কেবলের ওপর চীনা কমিউনিস্ট পার্টির (সিসিপি) নিয়ন্ত্রণ মোকাবিলা প্রকল্প’ নামে একটি কর্মসূচির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এই প্রকল্পের আওতায় নিরাপদ সমুদ্রতলের কেবল স্থাপন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে চীনা প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বিশ্বস্ত বেসরকারি কোম্পানির সঙ্গে কাজ করতে সহায়তা করবে যুক্তরাষ্ট্র।
এর মাধ্যমে পুরোনো টেলিযোগাযোগ কেবল বদলে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট নিরাপদ অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, নিকারাগুয়া ও হাইতি এই সুবিধা পেতে পারে।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের কিছু অংশ নিকারাগুয়ায় থাকলেও দেশটির সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কাজ করবে না।

চীনা বিনিয়োগকে নিরাপত্তা ঝুঁকি মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে চীনের টেলিযোগাযোগ, অবকাঠামো ও বন্দর খাতে বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, চীনের প্রকল্পগুলো শুরুতে কম ব্যয়বহুল মনে হলেও পরে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিলম্ব এবং নিম্নমানের সেবার কারণে সেগুলোর প্রকৃত খরচ অনেক বেড়ে যায়।
রিপোর্ট, সমুদ্রতলের কেবল প্রকল্পের বাইরে চীনের বৈশ্বিক প্রভাব মোকাবিলায় প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ের আরও বিভিন্ন প্রকল্প বিবেচনা করছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

এপির পর্যালোচনা করা পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি অভ্যন্তরীণ নথিতে বলা হয়েছে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তাই এর জবাব দেয়া জরুরি।
নথিতে ৩৪ কোটিরও বেশি ডলার ব্যয়ে ৫০টির বেশি প্রকল্পের প্রস্তাব রয়েছে। এসব প্রকল্পের অধিকাংশই লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়াকেন্দ্রিক। এর মধ্যে অনেক উদ্যোগ আগেই অনুমোদিত হয়েছিল।
তবে ইলন মাস্কের নেতৃত্বাধীন ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিশিয়েন্সির (ডিওজিই) বাজেট কমানো ও জনবল ছাঁটাইয়ের কারণে সেগুলো স্থগিত হয়ে যায়।
ওই সময় মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ইউএসএআইডি) বিলুপ্ত করা হয় এবং শত শত কূটনৈতিক পদও বাতিল করা হয়।

সাইবার নিরাপত্তা, বন্দর ও খনিজ সম্পদে নজর
যুক্তরাষ্ট্রের এসব নতুন পরিকল্পনার মধ্যে আর্জেন্টিনা ও বেলিজে সাইবার নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব রয়েছে। এসব কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে চীনের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপ থেকে সুরক্ষার কাজ করবে।
এ ছাড়া ইকুয়েডর, জ্যামাইকা, মেক্সিকো, প্যারাগুয়ে, পেরু ও উরুগুয়েতে বন্দর পরিচালনা, গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ খাতে চীনের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা মোকাবিলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
পাশাপাশি পরবর্তী দালাই লামা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় চীনের প্রভাব ঠেকাতে নিরাপদ যোগাযোগ প্রযুক্তি সরবরাহ, চীনের মহাকাশ কর্মসূচির প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন কমানো এবং নজরদারি ও সেন্সরশিপ প্রযুক্তি রপ্তানিকারী চীনা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম মোকাবিলার উদ্যোগও বিবেচনায় রয়েছে।

কূটনৈতিক সংলাপ চললেও কৌশলগত প্রতিযোগিতা
এই নতুন অর্থায়নের পরিকল্পনা স্পষ্ট করছে যে, বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল করার প্রচেষ্টা চললেও কৌশলগত প্রতিযোগিতা থেকে সরে আসছে না ওয়াশিংটন।
আগামী সেপ্টেম্বরে, নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সম্ভাব্য ওই বৈঠকের আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্মেলনের ফাঁকে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-এর সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, সর্বশেষ এই প্রস্তাবগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত থাকলেও বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা এখনও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন