একসময় প্রতিদিন নিজের পোষা পাখির সঙ্গে সময় কাটাতেন, তার খাঁচা পরিষ্কার করতেন, আদর করতেন এবং পাখিকে উড়তে দিতেন। কিন্তু এখন আর এসব ইচ্ছের কোনোটিই নেই। ঢাকার নিজের অগোছালো ঘরে শুয়ে থাকা চল্লিশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি এসব কথা বলছিলেন। তিনি নিজের পরিচয় গোপন রাখতে ‘মেটালফ্রিক’ ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন।
ওই ব্যক্তি বলেন, এখন আর সেসব করতে মন চায় না। এসবে কার কী আসে যায়? মেটালফ্রিক জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা নেশায় আসক্ত। এতে তার জীবন পুরোপুরি ‘শেষ’ হয়ে গেছে।
আইরিশ টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি এই মাদক বাংলাদেশে অসংখ্য মানুষের জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে।
মেটালফ্রিকের ভাষায়, এই জিনিসটা আমার মস্তিষ্ক পুরোপুরি নষ্ট করে দিয়েছে।
থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’ শব্দের অর্থ ‘পাগল করার ওষুধ’। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ এই মাদকে আসক্ত। সেই সঙ্গে এই মাদক ব্যবহার করে ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে।
মেটালফ্রিক বলেন, ইয়াবার প্রভাব চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা থাকে। এরপর তিনি টানা তিন দিন জেগে থাকতে পারেন এবং পরে টানা ১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় ঘুমান।
গত জুনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দেশের প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশ কোনো না কোনো মাদকে আসক্ত। তিনি বলেন, নতুন ধরনের সিনথেটিক ও আধা-সিনথেটিক মাদকের আবির্ভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ মাদক-সংক্রান্ত কিছু অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বহাল রেখে একটি বিলও পাস করেছে।
বাংলাদেশে ইয়াবাকে ‘ক-শ্রেণির’ নিষিদ্ধ মাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত। ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের সময় ইয়াবাবিরোধী ব্যাপক অভিযান চালানো হয়। কয়েক মাসের মধ্যে ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন, যা অনেকের কাছে ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’-এর সঙ্গে তুলনীয় ছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দাবি, ২০১৮ সালে ৪৬৬ জন নিহত হন। সংস্থাটির অভিযোগ ছিল, মাদকবিরোধী অভিযানের নামে ওই বছর বাংলাদেশের দরিদ্র এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং মাদকের সঙ্গে জড়িত থাকার সামান্য সন্দেহেই মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হওয়ার ভয় পেত। এ ছাড়া একই সময়ে দশ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সেই সময় বাংলাদেশের এসব ঘটনা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।
মানসিক স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি বড় সমস্যা
ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার এবং নিরাময় পুনর্বাসন কেন্দ্রের চিকিৎসক ডা. মো. আরিফুজ্জামান বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা দিয়ে মাদকাসক্তি কমানো সম্ভব নয়।
তার মতে, মাদকের ব্যবহার কমাতে হলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি করতে হবে। তিনি জানান, পুরো বাংলাদেশে মাত্র ৩৫০ জনের মতো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে কখনও কখনও এক ঘণ্টায় ২০ জন রোগী দেখতে হয়। আরিফুজ্জামান বলেন, দেশে প্রশিক্ষিত মনোবিজ্ঞানীরও তীব্র সংকট রয়েছে। তাই তিনি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে একীভূত করার আহ্বান জানান।
২০১৮-১৯ সালে পরিচালিত বাংলাদেশের সর্বশেষ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপে দেখা যায়, যাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজন, তাদের প্রায় ৯০ শতাংশই কোনো চিকিৎসা নেন না।
আরিফুজ্জামানের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার এখনো রয়েছে, তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ডা. আরিফুজ্জামান বলেন, ইয়াবা এখন খুবই সাধারণ মাদক হলেও অনেক ব্যবহারকারী একই সঙ্গে হেরোইন, বুপ্রেনোরফিন ইনজেকশন ও ওমরফোন ট্যাবলেটও গ্রহণ করেন।
তিনি জানান, কেউ কেউ দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণ করেও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তবে যাদের মস্তিষ্কে আগে থেকেই কিছু দুর্বলতা থাকে, তারা দ্রুত গুরুতর আসক্ত হয়ে পড়েন। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড বা কোভিড-১৯ মহামারির মতো সংকটও অনেককে মাদকের দিকে ঠেলে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মাদকাসক্ত নিজের নেশার খরচ জোগাতে শেষ পর্যন্ত মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। এ ছাড়া বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত সমস্যা বা মানসিক বিকারের মতো রোগে ভোগা অনেক মানুষ সাময়িক স্বস্তির আশায় মাদক গ্রহণ শুরু করেন।
গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি) জানিয়েছে, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের সীমান্তবর্তী ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’ অঞ্চল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সিনথেটিক মাদক উৎপাদনকেন্দ্র।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ২৩৬ টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৪ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশে আসা অধিকাংশ ইয়াবা মিয়ানমারে উৎপাদিত বলে ধারণা করা হয়।
‘ইয়াবা মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়’
মেটালফ্রিক বলেন, বাংলাদেশে অনেকেই প্রথমে সিগারেট, পরে গাঁজা, তারপর কাশির সিরাপ এবং শেষে ইয়াবায় আসক্ত হন। তার ভাষায়, প্রথমবার ভেবেছিলাম এটা খেয়ে আরাম লাগবে। কিন্তু এটা মাথাকে আকাশে তুলে দেয়। এই জিনিস মানুষকে পশু বানিয়ে দেয়।
তিনি বলেন, আগে ইয়াবার দাম বেশি ছিল। এখন বাজারে সস্তা ও দামি- দুই ধরনের ইয়াবা পাওয়া যায়। সস্তা ইয়াবা মুখ ও দাঁতের মারাত্মক ক্ষতি করে। দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে অনেকের স্ট্রোক হয়, দাঁত পড়ে যায় কিংবা শরীর কাঁপতে থাকে।
মেটালফ্রিকের দাবি, এখন আফিম বা হেরোইন পাওয়া আগের তুলনায় কঠিন। ইয়াবাই অন্য মাদকের জায়গা দখল করে নিয়েছে।
তিনি বলেন, ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকায় প্রকাশ্যেই তরুণদের ইয়াবার প্যাকেট বিক্রি করতে দেখা যায়। এমনকি রিকশাচালকদেরও সেখান থেকে ইয়াবা কিনতে দেখা যায়।
আইরিশ টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, অর্থনৈতিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তরুণদের অনিশ্চয়তাও অনেকের জীবনে হতাশা বাড়িয়ে তুলেছে।
মেটালফ্রিকের দাবি, অর্থনৈতিক পরিস্থিতিই বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদ, অপরাধ ও মাদকাসক্তির মতো সমস্যাগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
তিনি বলেন, ইয়াবা মানুষকে মিথ্যা আত্মবিশ্বাস দেয়। কিন্তু যারা নিয়মিত এটি ব্যবহার করে, তারা দুই বছরের বেশি টিকতে পারে না, কারণ তারা ঠিকমতো ঘুমায় না। এটা ধীরে ধীরে বিষ প্রয়োগের মতো- খুব পরিকল্পিতভাবে মানুষকে ধ্বংস করে।
