আগামীকাল অস্ট্রেলিয়ার পার্থে শুরু হচ্ছে এএফসি নারী এশিয়ান কাপ ফুটবল। মঙ্গলবার সিডনিতে চীনের বিপক্ষে মাঠে নামবে বাংলাদেশ নারী ফুটবল। অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে বড় রাজ্য নিউ সাউথ ওয়েলস। নারী এশিয়ান কাপের ফাইনাল খেলা হবে সিডনির অলিম্পিক পার্ক স্টেডিয়ামে। সিডনি যাওয়ার পথে কলম্বোতে ট্রানজিটের সময় দেখা হয়ে গেল শ্রীলঙ্কার ফুটবল লিজেন্ড পাকির আলীর সঙ্গে। দীর্ঘদিন ঢাকা আবাহনীতে খেলেছেন এই লঙ্কান ডিফেন্ডার। আবাহনী, মোহামেডান, শেখ জামাল, বিজেএমসি বাংলাদেশ পুলিশ ফুটবল ক্লাবে কোচিং করিয়েছেন তিনি। কাজ করেছেন শ্রীলঙ্কা জাতীয় দলেও। এখন ব্যস্ত নিজস্ব একটি ফুটবল একাডেমি নিয়ে। যেখানে চার পাঁচশ খুদে ফুটবলার আছেন আগামীর তারকা হওয়ার দৌড়ে। পাশাপাশি এখানকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের দোভাষী হিসেবে কাজ করছেন সাবেক এই লঙ্কান ডিফেন্ডার। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের ফুটবলসহ নানা বিষয় নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। আলাপের কিছু অংশ মানবজমিনের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-
প্রশ্ন: শ্রীলঙ্কার ফুটবলের অবস্থা কী? বাংলাদেশের মতো শ্রীলঙ্কা দলেও অনেক প্রবাসী বংশদ্ভূত ফুটবলার। তাদের দিয়ে লঙ্কান ফুটবলের উন্নতি কতটুকু সম্ভব?
পাকির আলী: এই মুহূর্তে শ্রীলঙ্কা দলে অনেক বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড় যোগ দেয়ায় জাতীয় দলের শক্তি বেড়েছে। এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে শ্রীলঙ্কা ভালো করেছে। আমার বিশ্বাস এদের নিয়ে জাতীয় দলের আরো ভালো করা সম্ভব। কারণ লোকাল ফুটবলারদের চেয়ে তাদের কোয়ালিটি ভালো। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপেও বাংলাদেশ-ভারতকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হবে শ্রীলঙ্কা।
প্রশ্ন: শ্রীলঙ্কার ফুটবলের এই পরিবর্তনের পেছনে কারা কাজ করছেন?
পাকির আলী: শ্রীলঙ্কা ফুটবল ফেডারেশনের নতুন প্রেসিডেন্ট জসর ওমম দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা লঙ্কান বংশদ্ভূত ফুটবলারদের জাতীয় দলে খেলানোর চেষ্টা করছেন। এই মুহূর্তে বিশ জনের মতো বংশদ্ভূত ফুটবলার আছেন লঙ্কান দলে। তবে এদের মান তোমাদের হামজা চৌধুরী, শমিত সোমের মতো না। বিশেষ করে চৌধুরী, ও অনেক বড় লীগে খেলে। অনেক অভিজ্ঞ। চৌধুরী একাই তিন জনের খেলা খেলতে পারে। তবে শ্রীলঙ্কাতেও যারা আসছে তারাও ভালো। তাদের মধ্যেও দুই একজের কোয়ালিটি অনেক ভালো।
প্রশ্ন: এই মুহূর্তে বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কার লড়াই কেমন হবে?
পাকির আলী: এখনকার সময়ে শ্রীলঙ্কা দল বাংলাদেশ দলের সঙ্গে লড়াই করতে পারবে। মানে, এই বিদেশি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়ে বাংলাদেশ দলের সঙ্গে শ্রীলঙ্কার একটি ভালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। কারণ আমাদের লেভেল এখন উপরে উঠেছে এবং তারা ভালো খেলছে। তবে আবার এখানে একটি বিষয় আসে, যেমন চৌধুরী (হামজা চৌধুরী) সে অনেক উঁচু মানের খেলোয়াড়। সে লেস্টার সিটিতে খেলেছে, তাই আমি মনে করি সে একাই পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
প্রশ্ন: শ্রীলঙ্কার বর্তমান স্থানীয় ফুটবলের কাঠামো কেমন? লীগ কি নিয়মিত হচ্ছে এখানে?
পাকির আলী: না, আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। বাংলাদেশে আবাহনী, মোহামেডান, এখন বসুন্ধরা কিংসের মতো শক্তিশালী ক্লাবগুলোর কারণে একটি ভালো প্রিমিয়ার লীগ হয়। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় সম্প্রতি কিছু সমস্যার কারণে আমরা লীগ টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে পারিনি। তবে এখন আমরা শুরু করেছি। প্রেসিডেন্ট আসার পর তিনি ডিভিশন-১ এবং চ্যাম্পিয়নস লীগ শুরু করেছেন। এখন মার্চ বা এপ্রিলে আমরা সুপার লীগ টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে যাচ্ছি। তাই ধীরে ধীরে এবং স্থিরভাবে কাজ চলছে।
প্রশ্ন: আপনি শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাবের সঙ্গে কাজ করেছেন। কিন্তু ২০২৪ সালে সরকার পরিবর্তনের পর এই ক্লাবটি আসলে ধ্বংস হয়ে গেছে? আপনি কি বিষয়টি জানেন?
পাকির ভাই: হ্যাঁ, ২০১১ সালে আমি শেখ জামালে কাজ করেছি। ওই বছর আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম। আমি জেনেছি শেখ জামাল ধানমণ্ডি ক্লাব, শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র লীগে খেলছে না। আবাহনীতেও লুটপাট হয়েছে। সকল ট্রফি খোয়া গেছে। এটা আসলেই দুঃখজনক। আমি সত্যিই যা অনুভব করি তা হলো রাজনীতি কখনোই খেলাধুলার ভেতরে আসা উচিত নয়।
প্রশ্ন: ২০১১ সালে আপনার দলের গোলরক্ষক আমিনুল হক বর্তমান সরকারের ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। বিষয়টি আপনার কাছে কতটা আনন্দের?
পাকির আলী: আরে বাপ রে! প্রচুর, প্রচুর ভাই! একটা গল্প বলি। শেখ জামালে আসার আগে আমার মায়ানমারের একটা প্রফেশনাল টিমে যাওয়ার কথা ছিল। আমার ভিসাও হয়ে গিয়েছিল, আমি শুধু টিকিটের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। এমন সময় হঠাৎ আমিনুল হক আমাকে ফোন করলো। ও বলল, “ওস্তাদ, কই আপনি?” আমি বললাম, “আমি তো বাসায় ভাই, আমি টিকিটের জন্য বসে আছি, মিয়ানমার যাচ্ছি।” ও বলল, “না না, আপনি তো যাইতে পারবেন না!” যখনই বাংলাদেশের কথা আসলো, আমার মনে হলো যে ওখানে (মিয়ানমার) না যাওয়াটাই আমার জন্য ভালো হবে। আমি মিয়ানমারের ক্লাবের টেকনিক্যাল ডিরেক্টরকে (যিনি আমার ভালো বন্ধু) মিথ্যা বলতে বাধ্য হলাম যে, আমার ফেডারেশন আমাকে ছাড়পত্র দিচ্ছে না। এভাবেই আমি বাংলাদেশে চলে আসলাম। বাংলাদেশের জন্য আমার মনে অন্যরকম একটা জায়গা আছে। যার কারণে এখানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীদের দোভাষী হিসেবে কাজ করছি। এর জন্য কোনো বেতন আমি নিচ্ছি না। শুধুমাত্র বাংলাদেশের প্রতি আমার ভালোবাসা থেকেই করছি। কারণ বাংলাদেশ আমাকে অনেক কিছু দিয়েছে।
