ফিফার আদলে বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের পরিধি বাড়ানোর পথে হাঁটছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। বৃটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, পুরুষদের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ২০ থেকে বাড়িয়ে ২৪ করার পরিকল্পনা করছে আইসিসি। ২০৩২ সালের আসর থেকে এই নতুন কাঠামো কার্যকর করার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্ব জুড়ে ক্রিকেটের প্রসার এবং জনপ্রিয়তাকে তুঙ্গে তোলার দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবেই এই সমপ্রসারণের কথা ভাবছে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা। দীর্ঘমেয়াদে টুর্নামেন্টটিকে ৩২ দলে উন্নীত করার পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে আইসিসির নীতিনির্ধারকদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা চলছে।
সম্প্রসারণের নেপথ্যে বাণিজ্যিক সমীকরণ
এই সিদ্ধান্তের পেছনে কেবল খেলার প্রসারই নয়, রয়েছে শক্তিশালী বাণিজ্যিক হিসাব-নিকাশ। টেলিগ্রাফের মতে, দল বাড়লে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ভারতসহ বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো। কারণ এতে তারা অধিক ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবে। বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতের অতুলনীয় বাণিজ্যিক শক্তির কারণে তাদের বেশি ম্যাচ মানেই সমপ্রচার স্বত্বের মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়া। নারীদের ক্রিকেটেও এই সমপ্রসারণ নীতি দৃশ্যমান। ২০৩০ সালের নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ১৬-তে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে নিশ্চিত করেছে আইসিসি।
ভবিষ্যৎ কাঠামো যেমন হতে পারে
২০২৮ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য পরবর্তী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ হবে রূপান্তরের একটি ধাপ। সেখানে চার দলের পাঁচটি গ্রুপ থেকে সেরা দুটি করে দল নিয়ে ‘সুপার টেন’ পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। ২০৩০ সালের আসরেও ২০ দলের কাঠামো বজায় থাকবে। তবে দলসংখ্যা ২৪-এ উন্নীত হলে চার দলের ছয়টি গ্রুপ হবে। প্রতিটি গ্রুপ থেকে সেরা দুটি দল নিয়ে ‘সুপার টুয়েলভ’ পর্ব। সুপার টুয়েলভ থেকে নকআউট পর্ব (সেমিফাইনাল ও ফাইনাল)। বর্তমান র?্যাঙ্কিং অনুযায়ী, দল বাড়লে উগান্ডা, পাপুয়া নিউগিনি, ইতালি ও হংকং সরাসরি লাভবান হবে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নেপাল ও নাইজেরিয়ার মতো উদীয়মান শক্তিগুলো বড় মঞ্চে খেলার সুযোগ পাবে। জার্মানিতে ক্রিকেটের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা বিবেচনায় সে দেশটিকেও নতুন সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইসিসি।
বিতর্ক ও যৌক্তিকতা
সমপ্রসারণের পক্ষে জোরালো যুক্তি থাকলেও, পুরনো বিতর্ক আবারো সামনে এসেছে। অধিক দলের অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতামূলক ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি থাকে এবং প্রতিষ্ঠিত শক্তিধর দেশগুলোর বিপক্ষে সহযোগী দেশগুলোর লড়াই একপেশে হওয়ার শঙ্কা থেকে যায়। ক্রিকেটের প্রকৃত বৈশ্বিকীকরণ নিশ্চিত করতে সহযোগী দেশগুলোর জন্য সুযোগ প্রয়োজন হলেও, এই বিস্তারের বাণিজ্যিক ইঞ্জিনটি মূলত হাতে গোনা কয়েকটি বড় দলের ম্যাচের ওপরই নির্ভরশীল। এই দ্বিমুখী টানাপোড়েনের কার্যকর সমাধান আইসিসি এখনো দিতে পারেনি। তবে সবশেষ বিশ্বকাপ প্রসারের পক্ষেই কথা বলছে। ২০২৪ আসরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাকিস্তানের পরাজয় কিংবা আফগানিস্তানের সেমিফাইনালে ওঠার মতো ঘটনাগুলো সহযোগী দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রমাণ। একইভাবে, ২০২৬ আসরে জিম্বাবুয়ের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং শ্রীলঙ্কা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলকে চাপে ফেলে দেয়া-এই বিষয়গুলো ছোট দলগুলোর সক্ষমতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
সাংঘর্ষিক নীতি নিয়ে প্রশ্ন
কিছুদিন আগে আগামী বছরের ৫০ ওভারের বিশ্বকাপে দলের সংখ্যা ১৪ থেকে কমিয়ে ১২ করার কথা তুলেছে আইসিসি। সেই সিদ্ধান্তে সমালোচনার ঝড় উঠে। চলতি মাসের শুরুতে বার্ষিক সম্মেলনে অনুমোদিত এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সহযোগী দেশগুলোর সাথে পরামর্শ না করার অভিযোগ উঠেছে। ওয়ার্ল্ড ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউসিএ) ও বিভিন্ন সহযোগী দেশ প্রশ্ন তুলেছে-এক ফরম্যাটে সুযোগ কমিয়ে অন্য ফরম্যাটে বাড়ানো কতটা যোক্তিক?
তাদের মতে, এই দ্বিমুখী নীতি আইসিসির নিজস্ব বৈশ্বিক সমপ্রসারণ-লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
