২০১৩ সালের ৫ই মে রাতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অভিযান পরিচালনার আগে পুলিশের কন্ট্রোল রুমে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এই অভিযানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে ‘জেনোসাইড’ (গণহত্যা) হিসেবে উল্লেখ দাখিল করা ফরমাল চার্জের শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, সেদিন রাত প্রায় ১০টার দিকে তৎকালীন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকারের সভাপতিত্বে পুলিশের কন্ট্রোল রুমে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
এতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকেই হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচি উচ্ছেদে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে অভিযান পরিচালনার করা হয়। পুলিশের অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সিকিউরড শাপলা’, র্যাবের ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ এবং বিজিবি’র ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’। পরে পুরো অভিযান ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নামে পরিচিতি পায়।
২০১৩ সালের ৫ই মে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গতকাল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের বিচারিক প্যানেল অভিযোগ পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একইসঙ্গে মামলায় গ্রেপ্তারকৃতদের আগামী ১৬ই আগস্ট হাজিরের নির্দেশ দেন। প্রসিকিউশন জানায়, হেফাজতের সমাবেশ ঘিরে সারা দেশে ৬২ জন নিহত হন। এর মধ্যে ঢাকাসহ ৪টি স্থানে ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত করেছে তদন্ত সংস্থা।
দুটি চার্জে ৫২ জনকে হত্যার অভিযোগ: চার্জ-১: ৫ই মে দুপুর পৌনে ১টা থেকে পরের দিন ভোর ৫টা পর্যন্ত ঢাকা মহানগরের মতিঝিল থানাধীন শাপলা চত্বর এবং আশপাশের এলাকায় শহীদ আবু বকর সিদ্দিকসহ (৩২) জনকে হত্যা, ৪ জন নিখোঁজ এবং মো. রাশেদুল ইসলামসহ অনেককে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করে ও নির্যাতনে মারাত্মক জখম করার অপরাধ। যা গণহত্যার শামিল বলে উল্লেখ করা হয়। চার্জ-২: ৬ই মে সকাল সাড়ে ৭টায় নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন মাদানীনগর এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক এবং আশপাশ এলাকা। শহীদ মো. ছাদেক মিয়াসহ ২০ জনকে গুলি করে হত্যা এবং ভিকটিম মো. আবু ইউসুফসহ অনেককে হত্যার উদ্দেশ্যে গুলি করে মারাত্মক জখম করার অপরাধ উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া মামলার শুনানি কালে চিফ প্রসিকিউটর জানান, চট্টগ্রামে হত্যাসহ বাকি ঘটনায় একটি সম্পূরক চার্জ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা হবে।
যারা আসামি হলো: শাপলা চত্বরের এ মামলায় যে ৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে তাদের মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীসহ ১৫ জন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য, ২১ জন বিভিন্ন বাহিনীর সাবেক সদস্য, তিনজন রাজনীতিবিদ ও সংগঠক এবং দু’জন সাংবাদিক রয়েছেন। এ মামলায় আসামিরা হলোÑ শেখ হাসিনা, ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, শামসুল হক টুকু, হাসানুল হক ইনু, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, ড. আব্দুর রাজ্জাক, মাহবুব-উল আলম হানিফ, হাসান মাহমুদ চৌধুরী, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, মৃনাল কান্তি দাশ, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ডা. দীপু মনি, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, ওমর ফারুক চৌধুরী, সালাউদ্দিন মাহমুদ ও ডা. ইমরান এইচ সরকার। এ ছাড়াও অন্য আসামিরা হলোÑ শাহরিয়ার কবির, মোজাম্মেল বাবু, ফারজানা রুপা, হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, জাবেদ পাটোয়ারী, বেনজীর আহমেদ, মোখলেসুর রহমান, জেনারেল আজিজ আহমেদ, জিয়াউল আহসান, মজিবুর রহমান, আব্দুল জলিল মণ্ডল, শেখ মো. মারুফ হাসান, মাহবুব হোসেন, মনিরুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, মুহা. আশরাফুজ্জামান, এস এম মেহেদী হাসান, হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, মো. আসাদুজ্জামান, এস এম শিবলী নোমান ও বি এম ফরমান আলী।
