প্রতিটি হৃদস্পন্দনের পেছনে একটি গল্প, প্রতিটি গল্পের পেছনে একটি যুদ্ধ

২৫০টি সফল প্রাইমারি পিসিআই’র গল্প

প্রতিটি হৃদস্পন্দনের পেছনে একটি গল্প, প্রতিটি গল্পের পেছনে একটি যুদ্ধ

ফন্ট সাইজ:

কেউ এই সংখ্যাটিকে দেখবেন শুধু ২৫০ হিসেবে। কিন্তু আমি যখন এই সংখ্যাটির দিকে তাকাই, তখন আমি দেখি ২৫০টি মুখ, ২৫০টি পরিবার, ২৫০টি কান্না, ২৫০টি প্রার্থনা এবং ২৫০টি নতুন করে ফিরে পাওয়া জীবন।

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ শুরু হয়েছিল এক স্বপ্নের যাত্রা। লক্ষ্য ছিল খুবই সাধারণ, কিন্তু দায়িত্ব ছিল অসাধারণ—হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত একজন মানুষ যেন শুধু সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে পৃথিবী থেকে বিদায় না নেন।
সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল সময়ের বিরুদ্ধে এক নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধ।
রাত ২টার ফোন, ভোর ৪টার অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন, ইফতারের ঠিক আগে হাসপাতালের উদ্দেশে ছুটে যাওয়া, তারাবির নামাজের মাঝপথে কিংবা সেহরির সময় জরুরি ফোন পেয়ে ক্যাথল্যাবে পৌঁছে যাওয়া, ঈদের নামাজের আগেই হাসপাতালের পথে যাত্রা, শীতের ভোর রাতে ফজরের নামাজের আয়ানের আগে ক্যাথ ল্যাব টীম নিয়ে জীবন বাঁচাতে যুদ্ধে নামা, পরিবারের সঙ্গে অসমাপ্ত রাতের খাবার, কিংবা সন্তানের নিষ্পাপ প্রশ্ন—“আবার হাসপাতালে যাচ্ছ?”
এসবই ধীরে ধীরে আমার জীবনের অংশ হয়ে গেছে। কারণ তখন একজন চিকিৎসকের পরিচয়ের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একটি পরিচয়—একজন মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্ব।

ক্যাথল্যাবের দরজা খুলেছে অসংখ্যবার। মনিটরের নিরবচ্ছিন্ন বিপ-বিপ শব্দ, অ্যাঞ্জিওগ্রামের পর্দায় হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়া একটি করোনারি ধমনী, তারপর দক্ষ হাতে সেই ধমনীর ভেতর দিয়ে আবার রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার সেই অবর্ণনীয় মুহূর্ত—মনে হয়েছে যেন মৃত্যুর অন্ধকার ভেদ করে জীবনের আলো ফিরে আসছে।
প্রতিবার সফলভাবে স্টেন্ট প্রতিস্থাপনের পর যখন মনিটরে হৃদয়ের স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে এসেছে, তখন মনে হয়েছে—আজও হয়তো একটি শিশু তার বাবাকে ফিরে পাবে, একজন মা তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারবেন, একজন স্ত্রী তার জীবনসঙ্গীকে আবার ঘরে নিয়ে যেতে পারবেন, কিংবা বৃদ্ধ বাবা-মা তাঁদের সন্তানের মুখটি আরেকবার দেখতে পারবেন।
একজন চিকিৎসকের জীবনে এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী হতে পারে?
এই ২৫০টি সফল চৎরসধৎু চঈও-এর প্রতিটি কেস আমাকে নতুন করে জীবনকে চিনতে শিখিয়েছে।

শিখিয়েছে জীবন কতটা অনিশ্চিত।
শিখিয়েছে প্রতিটি মিনিট কত অমূল্য।
শিখিয়েছে একটি দ্রুত সিদ্ধান্ত, একটি দক্ষ হাত এবং একটি সমন্বিত টিম কখনো কখনো একটি পুরো পরিবারকে চিরদিনের কান্না থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে।
অনেক রোগী এসেছেন মৃত্যুর দুয়ার থেকে। কারও রক্তচাপ ছিল না, কারও হৃদযন্ত্র প্রায় থেমে যাচ্ছিল, কেউ ছিলেন কার্ডিওজেনিক শকে, কেউ আবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট থেকে ফিরে এসেছেন।
সেই মুহূর্তগুলোতে কোনো চিকিৎসক একা থাকেন না।
সেখানে কাজ করে একটি স্বপ্ন, একটি টিম, একটি বিশ্বাস এবং অসংখ্য মানুষের নিরলস পরিশ্রম।

তাই এই অর্জন কখনোই একজন মানুষের একার নয়।
এটি আমাদের ক্যাথল্যাব টিমের, সিসিই -টিমের, জরুরী বিভাগের, নার্সদের, টেকনোলজিস্টদের, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের, কার্ডিয়াক কাস্টমার কেয়ারের এবং হাসপাতালের প্রতিটি দৃশ্যমান ও অদৃশ্য স্টাফদের সম্মিলিত ভালোবাসা, ত্যাগ, নিষ্ঠা ও দায়িত্ববোধের ফল।
আর এই সবকিছুর ঊর্ধ্বে আছেন মহান আল্লাহ।
অনেক সময় এমন রোগী এসেছে, যাকে দেখে মনে হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সব সম্ভাবনাই যেন শেষ হয়ে এসেছে।

কিন্তু সফল ইন্টারভেনশনের পর যখন সেই মানুষটি নিজের পায়ে হেঁটে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গেছেন, হাসিমুখে “ধন্যবাদ ডাক্তার” বলেছেন, তখন আবার উপলব্ধি করেছি
আমরা শুধু চেষ্টা করি। জীবন ফিরিয়ে দেন একমাত্র আল্লাহ।
এই ২৫০টি সফল Primary PCI কোনো সংখ্যা নয়।
-এটি ২৫০টি পরিবারের হাসি।
-২৫০টি মায়ের দোয়া।
-২৫০টি সন্তানের স্বস্তির নিঃশ্বাস।
-২৫০টি অসমাপ্ত স্বপ্নের নতুন সূচনা।

-২৫০টি মানুষের দ্বিতীয় জীবন।
এই পথচলা আমাকে আরও বড় একটি দায়িত্বের কথা প্রতিদিন মনে করিয়ে দেয়।
আমার স্বপ্ন—বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ যেন জানেন, হার্ট অ্যাটাক মানেই মৃত্যু নয়।
সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো, দ্রুত ECG, সঠিক রোগনির্ণয় এবং আন্তর্জাতিক মানসম্মত Primary PCI একজন মানুষকে আবার সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে।
আজ এই ২৫০টি সফল Primary PCI-এর যাত্রাপথে আমি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি আমার সকল শিক্ষককে, যাঁদের কাছ থেকে চিকিৎসার পাশাপাশি মানবিকতার শিক্ষা পেয়েছি।

কৃতজ্ঞতা জানাই আমার সকল সহকর্মী, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, আমাদের নিবেদিতপ্রাণ কার্ডিয়াক টিম এবং সর্বোপরি সেই সকল রোগী ও তাদের পরিবারের প্রতি, যাঁরা কঠিনতম মুহূর্তে আমার ওপর আস্থা রেখেছেন। আমার হৃদয়ের গভীর থেকে অসীম কৃতজ্ঞতা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের প্রতি। তার অশেষ রহমত, অনুগ্রহ ও দয়া ছাড়া একটি হৃদস্পন্দনও ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
২৫০টি সফল Primary PCI—এটি কোনো সমাপ্তি নয়।
এটি একটি নতুন অঙ্গীকার। যতদিন আল্লাহ আমাকে সামর্থ্য দেবেন, ততদিন সময়ের বিরুদ্ধে আমার এই যুদ্ধ চলবে।

যতদিন কোনো হৃদয় থেমে যাওয়ার আগে সাহায্যের আবেদন জানাবে, ততদিন আমি ছুটে যাব। যতদিন মানুষের বিশ্বাস থাকবে, ততদিন আমার দায়িত্বও থাকবে। কারণ প্রতিটি হৃদস্পন্দন অমূল্য। প্রতিটি জীবন আমার কাছে আল্লাহর অর্পিত একটি আমানত। আলহামদুলিল্লাহ। ২৫০টি সফল Primary PCI—২৫০টি নতুন জীবনের গল্প। ইনশাআল্লাহ,এই গল্প একদিন হাজার ছাড়িয়ে লাখ মানুষের জীবনে আশার আলো হয়ে পৌঁছে যাবে ।

লেখক: অধ্যাপক , এমবিবিএস (ডিএমসি), এমডি (কার্ডিওলজি), ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট, বিভাগীয় প্রধান,-কার্ডিওলজি বিভাগ পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ঢাকা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন