ট্রাম্পের সামনে একের পর এক সংকট

সিএনএনের বিশ্লেষণ

ট্রাম্পের সামনে একের পর এক সংকট

ফন্ট সাইজ:

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধ নতুন এক মোড়ে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তিন মাসের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর এ মাসে আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষই কৌশলগতভাবে স্পষ্ট সুবিধা অর্জন করতে পারেনি।

যুদ্ধ কার্যত অচলাবস্থায় আটকে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও এ নিয়ে সমর্থন কমতে শুরু করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, প্রায় টানা দুই সপ্তাহ রাতভর হামলা চালানোর পর বর্তমানে মার্কিন সামরিক অভিযান ‘সাময়িকভাবে স্থগিত’ রয়েছে। যদিও প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন বারবার সংঘাত আরও বাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে।

রিপাবলিকানদের চাপ কি বাড়বে?
যুদ্ধের শুরুতে যারা সমালোচনা করেননি, তাদের অনেকেই এখন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন- এই যুদ্ধ আর কতদিন চলবে? ফক্স নিউজের উপস্থাপক লরা ইনগ্রাহাম বলেন, ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। এতে অনেক রিপাবলিকান উদ্বিগ্ন। নভেম্বরে জিততে চাইলে এই যুদ্ধকে অনন্তকাল চলতে দেয়া যাবে না।
মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন যুদ্ধের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করলেও পরে বলেন, এখন আমাদের এটি শেষ করতে হবে।

অন্যদিকে লুইজিয়ানার রিপাবলিকান সিনেটর বিল ক্যাসিডি সিএনএনকে বলেন, আমার মতে, প্রেসিডেন্ট প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনের যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছেন। আমি তখনও সমর্থন করেছিলাম যে, যুদ্ধ শেষ করা উচিত। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা হয়নি।

তবে ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধ শেষ করাও সহজ নয়। ইরান এখন পর্যন্ত কোনো পারমাণবিক চুক্তিতে রাজি হওয়ার ইঙ্গিত দেয়নি। এমনকি আগে আলোচিত সমঝোতা স্মারকও কার্যকর হয়নি। একই সঙ্গে ট্রাম্পের নতুন হামলা ও হুমকিও তেহরানকে নতি স্বীকারে বাধ্য করতে পারেনি। বিশেষ করে যদি ইরান হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, তাহলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরাজয় হিসেবে দেখা হতে পারে।

মার্কিন সেনা নিহত হওয়ায় জনসমর্থন আরও কমবে?
মার্চের পর যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার পর থেকে চারজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ট্রাম্প স্পষ্টভাবেই উদ্বিগ্ন যে, এসব মৃত্যু জনসমর্থন আরও কমিয়ে দিতে পারে। তিনি বারবার বর্তমান হতাহতের সংখ্যা অতীতের বড় যুদ্ধগুলোর তুলনায় কম বলে উল্লেখ করছেন। একই সঙ্গে তিনি প্রমাণ ছাড়াই দাবি করছেন, নিহত সেনা ও তাদের পরিবার এই যুদ্ধকে সমর্থন করতেন। যদিও অন্তত একটি পরিবারের সদস্য প্রকাশ্যে ভিন্ন মত জানিয়েছেন।

গত মার্চে রয়টার্স-ইপসোসের এক জরিপে দেখা যায়, ৪২ শতাংশ রিপাবলিকান এবং ৫৩ শতাংশ স্বতন্ত্র ভোটার বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সেনা নিহত বা আহত হলে তারা যুদ্ধের বিরোধিতা করার দিকে আরও ঝুঁকবেন।

এদিকে পেন্টাগন সর্বশেষ তাদের তথ্য হালনাগাদ করে জানিয়েছে, নতুন করে আরও ১৪০ জনের বেশি সেনা আহত হয়েছেন। ফলে মোট আহতের সংখ্যা ৬০০-এর বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, হতাহতের সংখ্যা আগের যুদ্ধগুলোর তুলনায় কম হলেও এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য নিয়ে সাধারণ মার্কিন জনগণের সংশয় থাকায় সেনা মৃত্যুর প্রভাব অনেক বেশি হতে পারে।

ট্রাম্প কি যুদ্ধ আরও বাড়াবেন?
এখন পর্যন্ত ট্রাম্প বড় ধরনের সামরিক সম্প্রসারণ থেকে বিরত থেকেছেন। তবে দীর্ঘ অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে তিনি ও তার উপদেষ্টারা সংঘাত আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
গত সপ্তাহেও ট্রাম্প ইরানের অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দিয়েছেন।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন কিছু হামলা আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আরেকটি সম্ভাব্য পদক্ষেপ হতে পারে খার্গ দ্বীপ বা হরমুজ প্রণালির আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা। কিন্তু এর জন্য স্থলবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হতে পারে, যা নতুন করে বহু মার্কিন সেনার প্রাণহানির ঝুঁকি তৈরি করবে এবং যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত করবে।

ট্রাম্প সম্প্রতি অ্যাক্সিওসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় হামলার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তবে অতীতেও তিনি এমন হুমকি দিয়ে পরে পিছু হটেছেন।
সপ্তাহান্তে ট্রাম্প হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করেন। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওয়াল্টজ বলেন, প্রেসিডেন্ট আলোচনার জন্য কিছুটা সুযোগ দিতে চান।

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সংঘাত আরও বাড়ানোর বিরোধিতা করেছেন। ড্যান কেইন বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তেলের দাম কতটা বাড়তে পারে?
গত সপ্তাহে ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা বাব আল-মান্দেব প্রণালি অবরোধের ঘোষণা দেয় এবং লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এই জলপথ হরমুজ প্রণালির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট। ফলে সেখানে বিঘ্ন ঘটলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়, যা মে মাসের পর প্রথম। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম প্রতি গ্যালন ৪ ডলারেরও বেশি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানির দাম আরও বাড়লে যুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থন ধরে রাখা ট্রাম্পের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে।

ট্রাম্প কি লক্ষ্য আরও কমিয়ে আনবেন?
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ইরানের “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” ছাড়া কিছুই মেনে নেবেন না। তিনি ইরানকে স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করার কথাও বলেছিলেন। এমনকি ইরানের জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে সমঝোতা স্মারকের শর্তগুলো থেকে বোঝা যায়, তিনি ইতোমধ্যেই সেই লক্ষ্য অনেকটাই কমিয়ে এনেছেন।

এখন প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য তিনি কি আরও কম শর্ত মেনে নেবেন? যেমন, পারমাণবিক চুক্তি ছাড়াই যদি শুধু হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেয়া হয়, সেটাকেই কি তিনি সাফল্য হিসেবে তুলে ধরবেন?
ট্রাম্প এর আগেও দাবি করেছিলেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি কার্যত ধ্বংস হয়ে গেছে এবং মহাকাশ থেকে সেটি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।

কংগ্রেস কি এবার পদক্ষেপ নেবে?
রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস এখন পর্যন্ত ট্রাম্পকে যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে বেশ স্বাধীনতা দিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি কিছুটা বদলাতে শুরু করেছে। কংগ্রেস চাইলে যুদ্ধের অর্থায়ন কমিয়ে দিতে বা বিলম্বিত করতে পারে। প্রতিনিধি পরিষদে অর্থায়নের একটি বিল পাস হলেও সিনেটে সেটি পাস হবে কি না, তা অনিশ্চিত।
এছাড়া ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাবও কংগ্রেসে উত্থাপিত হয়েছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, ট্রাম্প প্রশাসন যুদ্ধবিরতির মধ্যবর্তী সময়কে আলাদা সংঘাত হিসেবে দেখিয়ে ৬০ থেকে ৯০ দিনের সাংবিধানিক সীমা এড়ানোর চেষ্টা করছে।
দক্ষিণ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ন্য্যান্সি মেস বলেন, কয়েক দিনের জন্য যুদ্ধ থামিয়ে আবার শুরু করলেই সেটি সংবিধানের দৃষ্টিতে নতুন যুদ্ধ হয়ে যায় না।

আলাস্কার সিনেটর লিসা মুরকাওস্কিও একই ধরনের মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে সিনেটর বিল ক্যাসিডি বলেছেন, খুব শিগগিরই কংগ্রেসকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন