ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ নিয়ে জটিল ও সংকটময় মোড়ের মুখোমুখি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সমীকরণ কি হবে তার সঠিক দিশা পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে ট্রাম্প ও তার প্রশাসনকে। সংঘাত যত দিন গড়াচ্ছে, ওয়াশিংটনের সামনে সামরিক ও কূটনৈতিক সমাধানের বিকল্প পথগুলো তত সংকুচিত হয়ে আসছে। কোনো একটি পথ বেছে নিতে গেলে তার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক খেসারত ও ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা সিএনএনের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্টিফেন কলিনসন তার এক বিশেষ বিশ্লেষণে ট্রাম্প প্রশাসনের এই ক্রমবর্ধমান কৌশলগত জট ও কঠিন দিকগুলোর বিশদ ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। টানা ১৩ রাতের ব্যাপক ও বিধ্বংসী বিমান হামলার পর ওয়াশিংটন সাময়িকভাবে তাদের সামরিক অভিযান স্থগিত রেখেছে। ট্রাম্প প্রশাসন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, এই স্থগিতাদেশ মূলত কূটনৈতিক আলোচনার একটা নতুন জায়গা তৈরি করার জন্য।
তবে এর পাশাপাশি মার্কিন প্রশাসন এটাও স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যেকোনো মুহূর্তে হামলা বহুগুণে বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাদের বাহিনী পুরোপুরি প্রস্তুত। কিন্তু কূটনৈতিক পথটি বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন ও জটিল। একইভাবে মসৃণ নয় সামরিক পথও। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরান কিছু আলোচনার ইঙ্গিত দিলেও, তাদের মূল দাবিতে কোনো পরিবর্তন আনেনি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’ দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণে নিজেদের অধিকার বজায় রাখার সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটতে সম্পূর্ণ নারাজ ইরান। যুদ্ধের প্রায় পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হতে চললেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেকে এক পরিচিত ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে দেখতে পাচ্ছেন। তীব্র হামলা চালিয়ে ইরানকে নতিস্বীকার করানোর কৌশল পূর্বে যেমন কার্যকর হয়নি, এখনও তেমনি ফল দিচ্ছে না। ফলে ট্রাম্পের সামনে এখন যে কয়েকটি বিকল্প রয়েছে, তার প্রতিটিই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। সরু এই পথগুলোতে ট্রাম্পকে পা ফেলতে হচ্ছে খুবই ভেবে চিন্তে। ট্রাম্পের সন্মুখে যে পদক্ষেপ রয়েছে তার দিকে নজর দেয়া যাক।
আকাশপথে হামলার তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া: ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের তেল অবকাঠামো, বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং পরিবহন ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক বা অর্থনৈতিক স্থাপনায় বড় ধরনের হামলা চালাতে পারে। এতে ইরানের অর্থনীতি পুরোপুরি পঙ্গু হয়ে যেতে পারে। তবে এর ফলে দেশটির কোটি কোটি সাধারণ নাগরিকের ওপর তীব্র মানবিক বিপর্যয় নেমে আসবে। যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প ইরানি জনগণকে সাহায্য করার যে কথা বলেছিলেন, এই পদক্ষেপ তার সম্পূর্ণ বিপরীত হবে। এমনকি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নে দেখা গেছে, এ ধরনের টানা বোমাবর্ষণেও তেহরানের কট্টরপন্থি শাসকদের অবস্থান পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না।
পূর্ণাঙ্গ সমুদ্র অবরোধ বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা: ইরানের জাহাজ ও বন্দরগুলোর ওপর নৌ-অবরোধ আরোপ করে দেশটির সরকারের অর্থপ্রবাহ এবং ইসলামিক রেভ্যুলেশনারি গার্ডস করপসের (আইআরজিসি) সামরিক রাজস্ব সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া। যাতে তারা কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারে। তবে এই কৌশল সফল হতে কয়েক মাস এমনকি কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ধৈর্য বা আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এত দীর্ঘ সময় নেওয়ার সুযোগ নেই। অধিকন্তু, এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক তেলবাহী ট্যাংকারে হামলা জোরদার করবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা দেবে।
স্থলভাগে সেনা মোতায়েন করা: মার্কিন সামরিক বাহিনীর প্রযুক্তিগত ও শক্তিমত্তার সুবাদে যুদ্ধক্ষেত্রে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য এটিই সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ হলো হাজার হাজার মার্কিন সেনাকে সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে পাঠানো, যেখানে বিপুল সেনার প্রাণহানি এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার চরম ঝুঁকি থাকবে। মার্কিন জনগণ এমনিতেই এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে, ফলে এমন সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করা: ইতিপূর্বে ভেঙে যাওয়া প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পুনর্বহাল করা। কিন্তু সেখানে তেহরান তখনই রাজি হবে, যখন তাদের হরমুজ প্রণালিতে নিজস্ব আইন প্রয়োগ ও শুল্ক আদায়ের দাবি মেনে নেওয়া হবে। এটিতে রাজি হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে। কারণ যুদ্ধের আগে এই আন্তর্জাতিক জলপথটি পুরোপুরি উন্মুক্ত ছিল। এমন ছাড় দিলে ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতির হার্ডলাইনার এবং রিপাবলিকান দলের ভেতরেই ট্রাম্প তীব্র সমালোচনার মুখে পড়বেন। এরই মধ্যে ওয়াশিংটনের ওপর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গত সপ্তাহে তেলের দাম বৃদ্ধিতে মার্কিনীদের দৈনন্দিন পেট্রোলের খরচ বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্বের অপরিশোধিত তেলের মজুতও আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে। তার ওপর লোহিত সাগরে ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরাও নতুন করে তেল সরবরাহ রুটগুলোতে হুমকি দিচ্ছে। সৌদি তেলের ট্যাংকারে হামলা চালালে বাব আল মান্দেব প্রণালিতেও আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে জাহাজের সংখ্যা। এই অবস্থা চলতে থাকলে আসন্ন নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যেখানে রিপাবলিকান দল কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। যেখানে তারা এমনিতেই পিছিয়ে রয়েছে সেখানে এই যুদ্ধের দীর্ঘসূত্রতা এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ট্রাম্পের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং যৌথ চিফ অফ স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন সংঘাত আরও বাড়ানোর মারাত্মক পরিণতি নিয়ে ট্রাম্পকে সতর্ক করেন। জেনারেল কেইন সামরিক বাহিনীর দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও ইন্টারসেপ্টর যুদ্ধাস্ত্রের ফুরিয়ে আসার বিষয়ে হোয়াইট হাউসকে অবহিত করেছেন।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে জনমত: সর্বশেষ জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী, ৭৬ শতাংশ সাধারণ মার্কিন নাগরিক মনে করেন ইরান যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রাথমিক ধারণার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও জটিল রূপ নিয়েছে। জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ দাবি করেছেন যে ইরান এখন অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী অবস্থানে থেকে আলোচনা করছে। তবে যুদ্ধের আসল বাস্তবতা হচ্ছে যতক্ষণ ইরান ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ এবং সমুদ্রপথে আঘাত হানা বজায় রাখতে পারছে, ততক্ষণ তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এক নিরবচ্ছিন্ন চাপের মুখে রাখতে সক্ষম। পাঁচ মাসের সংঘাত শেষেও ট্রাম্পকে বিজয়ী হিসেবে বের করে আনতে পারে, এমন কোনো স্পষ্ট বা সহজ কৌশলগত সমাধান আপাতত মার্কিন প্রশাসনের হাতে নেই।
