মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পর ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার আনতে কেন্দ্রীয় সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করেছে। এই বহুমুখী বিশেষজ্ঞ দলের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন একজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, একজন সাবেক মহাকাশ বিজ্ঞানী, একজন সাবেক গোয়েন্দা প্রধান, একজন শিক্ষাবিদ, একজন সাবেক শিক্ষা সচিব এবং একজন সরবরাহ ও লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্যাপক শিক্ষার্থী আন্দোলনের একদিন পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এর পরদিন রোববার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে এই টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেন। তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও ইনফোসিস-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা নন্দন নিলেকানি এই কমিটির নেতৃত্ব দেবেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় মোদি বলেন, আমাদের পরীক্ষা ব্যবস্থা হতে হবে নির্ভরযোগ্য, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। এসব বিষয় মাথায় রেখেই বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ নন্দন নিলেকানির নেতৃত্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তারা পরীক্ষা সংস্কারের ওপর কাজ করবেন এবং তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে যত দ্রুত সম্ভব আসন্ন পরীক্ষাগুলোর নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেয়া হবে।
নন্দন নিলেকানি: ভারতের প্রযুক্তি খাতের অন্যতম পরিচিত নাম নন্দন নিলেকানি। তিনি দেশের শীর্ষ তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইনফোসিস-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির নন-এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান। তিনি ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (ইউআইডিএআই) নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং আধার কার্ড প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আইআইটি বোম্বে থেকে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। তিনি পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা জোরদারে ভূমিকা রাখতে পারেন। এছাড়া প্রশ্নপত্র ও পরীক্ষা পরিচালনার জন্য এমন একটি সম্পূর্ণ এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে সহায়তা করতে পারেন, যা হ্যাক করা প্রায় অসম্ভব হবে।
ইসরোর সাবেক চেয়ারম্যান এস সোমনাথ: শ্রীধারা পানিক্কার সোমনাথ। তিনি এস সোমনাথ নামে বেশি পরিচিত। তিনি ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশনের (ইসরো) সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি একজন মহাকাশ প্রকৌশলী। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স, ব্যাঙ্গালোর থেকে মহাকাশ প্রকৌশলে স্নাতকোত্তর এবং আইআইটি মাদ্রাজ থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। তার নেতৃত্বেই চন্দ্রযান-৩ সফলভাবে চাঁদে অবতরণ করে। তিনি পরীক্ষা ব্যবস্থায় শূন্য-ত্রুটি (জিরো-এরর) প্রক্রিয়া এবং সাইবার গোয়েন্দা নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করতে পারেন। মহাকাশ অভিযানের মতো বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ও যাচাই পদ্ধতি চালু করলে প্রশ্নপত্র প্রস্তুত থেকে ফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে মানবিক ও প্রযুক্তিগত ভুলের ঝুঁকি অনেক কমে যাবে।
আইবির সাবেক পরিচালক তপন ডেকা: তপন কুমার ডেকা একজন সাবেক ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস (আইপিএস) কর্মকর্তা। তিনি ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) ২৮তম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী। পরীক্ষা মাফিয়া ও প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্র শনাক্ত করতে গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক এবং তাৎক্ষণিক সাইবার নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিতে পারবেন।
আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক ভি কামাকোটি: ভি কামাকোটি বর্তমানে আইআইটি মাদ্রাজের পরিচালক। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, তিনি আইআইটি মাদ্রাজ থেকেই কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে এমএস এবং পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ২০০১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে পরিচালক হন। তিনি ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় অর্থায়িত মাইক্রোপ্রসেসর ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম এবং ইনফরমেশন সিকিউরিটি এডুকেশন অ্যান্ড অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম-এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এছাড়া তিনি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজরি বোর্ড-এর সদস্য। পরীক্ষা পরিচালনার সফটওয়্যার ও সার্ভার অবকাঠামোকে সাইবার হামলা থেকে সুরক্ষিত রাখতে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন।
সাবেক শিক্ষা সচিব অনিতা কারওয়াল: অনিতা কারওয়াল গুজরাট ক্যাডারের সাবেক ইন্ডিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস (আইএএস) কর্মকর্তা। তিনি ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্কুল শিক্ষা ও সাক্ষরতা বিভাগের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে অবসর নেন। তিনি শিক্ষানীতি ও একাডেমিক সংস্কারের বিষয়ে অভিজ্ঞ। গ্রেস নম্বর নীতি, উত্তরসূচি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি এবং পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোর জন্য আরও কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণে তিনি পরামর্শ দিতে পারবেন।
লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ অমৃত লাল মীনা: অমৃত লাল মীনা একজন সাবেক আমলা। তিনি বিহারের মুখ্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২৫ বছরেরও বেশি কর্মজীবনে তিনি বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে বিশেষ সচিব (লজিস্টিকস) হিসেবেও কাজ করেছেন। সরবরাহ ব্যবস্থা ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনায় তিনি বিশেষজ্ঞ। প্রশ্নপত্র মুদ্রণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের জন্য জিপিএস ট্র্যাকিং, নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে খোলা যায় এমন ডিজিটাল লকযুক্ত কনটেইনারসহ টেম্পার-প্রুফ নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে তিনি পরামর্শ দিতে পারবেন। এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হলে ট্রাঙ্ক বা স্ট্রংরুম থেকে প্রশ্নপত্র উধাও হয়ে যাওয়া কিংবা গোপনে ছবি তুলে ফাঁস করার মতো ঘটনার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে মনে করা হয়।
