গ্যাস বিস্ফোরণে নিভলো একই পরিবারের তিন স্বপ্ন

দেবিদ্বারে মাতম

গ্যাস বিস্ফোরণে নিভলো একই পরিবারের তিন স্বপ্ন

ফন্ট সাইজ:

মাত্র দেড় মাস আগের কথা। নতুন সংসার ঘিরে বুকভরা হাজারো স্বপ্ন আর একরাশ আশা নিয়ে স্বামী ও আট বছরের ছোট্ট ভাগনিকে সঙ্গে করে রাজধানীতে পাড়ি জমিয়েছিলেন ফাহিমা আক্তার। ভেবেছিলেন, ইট-পাথরের শহরে নিজেদের মেধা ও পরিশ্রমে গড়ে তুলবেন ভালোবাসার সুন্দর একটি নীড়। কিন্তু বিধাতা হয়তো লিখেছিলেন অন্য এক করুণ ইতিহাস! একটি অবহেলা আর গ্যাস লাইনের বিষাক্ত লিকেজ মুহূর্তের মধ্যেই তাদের সব স্বপ্ন পুড়িয়ে ছাই করে দিলো।

কয়েক দিন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে জীবনের সঙ্গে লড়ে অবশেষে শনিবার সন্ধ্যায় না ফেরার দেশে চলে গেলেন কুমিল্লার দেবিদ্বারের মেয়ে ফাহিমা। একই দুর্ঘটনায় দগ্ধ হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তার স্বামী আনোয়ার হোসেন শাহীন এবং শুক্রবারে মারা যান ভাগনি হাফসা। একই পরিবারের তিনজনের এমন মর্মান্তিক বিদায়ে দেবিদ্বারে এখন বইছে শোকের মাতম, স্বজনদের কান্নায় বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। ?নিহত ফাহিমা আক্তার দেবিদ্বার উপজেলার গোমতী আবাসিক এলাকার গোলাম হোসেনের ছোট মেয়ে। তিনি জাফরগঞ্জ মীর আব্দুল গফুর ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে অনার্সে ভর্তি হয়েছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি কেক তৈরি ও পোশাক বিক্রিসহ নানা পণ্যের অনলাইন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের একটা শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চেয়েছিলেন। স্বপ্ন ছিল নিজের ব্যবসাকে অনেক দূর এগিয়ে নেয়ার। সেই লক্ষ্যেই স্বামী শাহীনের হাত ধরে ওঠে এসেছিলেন রাজধানীর বাড্ডার ভাড়া বাসায়। পরম মমতা আর মায়ের স্নেহে বড় করে তুলবেন- এই আশায় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন বড় বোনের আট বছরের শিশুকন্যা হাফসাকে।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ১৯শে সেপ্টেম্বর দেবিদ্বারের ৯নং গুনাইঘর উত্তর ইউনিয়নের বাঙ্গুরী গ্রামের মীর্জা আলী ব্যাপারী বাড়ির শাহীনের সঙ্গে বিয়ে হয় ফাহিমার। দেড় মাস আগে তারা রাজধানীর উত্তর বাড্ডার ভাটারা এলাকার একটি ভবনের নিচতলায় বাসা ভাড়া নেন। তাদের সঙ্গে ঢাকায় পড়তে এসেছিল ফাহিমার ভাগনি হাফসা। গত ২১শে জুলাই রাত আনুমানিক ৩টার দিকে হঠাৎ বাসাটায় গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে বিকট শব্দে ঘটে এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে দু’টি কক্ষে। ?আগুনের জ্বলন্ত দাহে আশঙ্কাজনকভাবে দগ্ধ হন ফাহিমা, তার স্বামী শাহীন ও শিশু হাফসা। উদ্ধার করে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। সেখানে শরীরের ৭০ শতাংশ দগ্ধ নিয়ে ফাহিমা কয়েক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে শনিবার সন্ধ্যায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তার আগেই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যায় তার স্বামী ও সঙ্গে থাকা ভাগনি হাফসা। ?দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পর শুক্রবার বাদ মাগরিব শিশু হাফসাকে দাফন করা হয় তার বাবার বাড়ি দেবিদ্বারের সুলতানপুর গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে। আর শাহীনকে দাফন করা হয় বাঙ্গুরী গ্রামে তার পারিবারিক কবরস্থানে। রোববার সকাল সাড়ে ৯টায় দেবিদ্বার পৌর সদরের গোমতী আবাসিক এলাকার চানমিয়া মার্কেট মাঠে ফাহিমার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় বাঙ্গুরী গ্রামে শাহীনের পারিবারিক কবরস্থানে স্বামীর পাশেই দাফন হয় ফাহিমার। ?মেয়েকে হারিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে পিতা গোলাম হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাসায় ওঠার পরপরই আমরা বাড়ির মালিককে গ্যাস লিকেজের বিষয়টি জানিয়েছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের এই কথাকে কোনো গুরুত্বই দেয়নি! সময়মতো একটু ব্যবস্থা নিলে আজ আমার মা-টা বেঁচে থাকতো। অবহেলার কারণে আজ আমার মেয়েকে হারালাম, আমি এই অবহেলার দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।’ তিনি আরও বলেন, মেয়ের সঙ্গে আমার বড় মেয়ের ঘরের নাতনি হাফসাও ঢাকায় গিয়েছিল। ওদের একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশা ছিল আমাদের। কিন্তু সামান্য একটা অবহেলা আর অসাবধানতায় এক নিমেষেই সব শেষ হয়ে গেল।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন