দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে কি বদলে যাচ্ছে শক্তির সমীকরণ?

ব্রিকসের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের নতুন দিগন্ত

দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিতে কি বদলে যাচ্ছে শক্তির সমীকরণ?

ফন্ট সাইজ:

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আগামী সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে আমন্ত্রণপত্রটি গ্রহণ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। তবুও এই আমন্ত্রণের কূটনৈতিক তাৎপর্য অনস্বীকার্য। কারণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জগতে প্রতিটি উচ্চপর্যায়ের আমন্ত্রণ কেবল প্রোটোকল নয়; বরং তা ভবিষ্যৎ সম্পর্ক, কৌশলগত অগ্রাধিকার এবং ভূরাজনৈতিক বার্তারও প্রতিফলন।

বিশ্ব রাজনীতি আজ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। একসময়ের এক মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা ক্রমশ বহুমেরুকেন্দ্রিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। অর্থনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাস, প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তন এবং কৌশলগত অংশীদারিত্ব আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ব্রিকস, যা আজ আর কেবল একটি অর্থনৈতিক জোট নয়; বরং বৈশ্বিক দক্ষিণের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আত্মপ্রকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রতি ভারতের এই কূটনৈতিক উদ্যোগকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগরাষ্ট্র। বঙ্গোপসাগর, ইন্দো-প্রশান্ত অঞ্চল, আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, নীল অর্থনীতি, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা সব মিলিয়ে বাংলাদেশ আজ আন্তর্জাতিক কৌশলগত মানচিত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।

ভারতের জন্যও বাংলাদেশ কেবল একটি প্রতিবেশী নয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার, আঞ্চলিক যোগাযোগের কেন্দ্র এবং বঙ্গোপসাগরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান আগ্রহ বাংলাদেশকে একটি প্রতিযোগিতামূলক কূটনৈতিক পরিসরে নিয়ে এসেছে। ফলে নয়াদিল্লির প্রতিটি কূটনৈতিক পদক্ষেপ এখন বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে মূল্যায়িত হয়।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি একটি সুযোগও বটে। কারণ বর্তমান বিশ্বে সফল পররাষ্ট্রনীতি আর কেবল রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং অর্থনৈতিক কূটনীতি, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাজার সম্প্রসারণ এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে। যে দেশ যত বেশি বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারবে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার অবস্থান তত শক্তিশালী হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্যও এই পরিবর্তন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চল রাজনৈতিক বিরোধ, সীমান্ত সমস্যা এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসে আক্রান্ত। অথচ বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষের আবাস এই অঞ্চলে। কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি, স্বাস্থ্য এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহযোগিতার কোনো বিকল্প নেই। যদি বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এবং অন্যান্য প্রতিবেশী দেশ অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে দক্ষিণ এশিয়া বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

ব্রিকসের গুরুত্বও এখানেই। উন্নয়ন অর্থায়ন, অবকাঠামো বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা, কৃষি, স্বাস্থ্য, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে এই প্ল্যাটফর্ম ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের মতো দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির জন্য এটি নতুন বাজার, নতুন বিনিয়োগ এবং নতুন প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্বের সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কোনো একটি প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া মানেই অন্য কোনো পক্ষ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বর্তমান বিশ্বে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। ভারত যেমন একই সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করছে, আবার ব্রিকস ও অন্যান্য বহুপাক্ষিক কাঠামোতেও সক্রিয় রয়েছে, বাংলাদেশকেও তেমনি জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুমাত্রিক কূটনীতি পরিচালনা করতে হবে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বিনিয়োগ আকর্ষণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর। তৈরি পোশাক শিল্পের বাইরে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জাহাজ নির্মাণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শিল্পে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি। কূটনীতির প্রকৃত সাফল্য তখনই, যখন তা সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান, আয় এবং জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখে।

বাংলাদেশের সামনে আরেকটি বড় সুযোগ হলো নীল অর্থনীতি। বঙ্গোপসাগর কেবল সামুদ্রিক সীমা নয়; এটি ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। বন্দর উন্নয়ন, সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং আঞ্চলিক সমুদ্রপথ উন্নয়নে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনও দক্ষিণ এশিয়ার অভিন্ন সংকট। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, ভুটান এবং শ্রীলঙ্কা প্রত্যেকেই এর প্রভাব অনুভব করছে। সবুজ প্রযুক্তি, জলবায়ু অর্থায়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় যৌথ উদ্যোগ শুধু পরিবেশ নয়, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য।

ডিজিটাল অর্থনীতি আগামী দিনের প্রতিযোগিতার নতুন ক্ষেত্র। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য অবকাঠামো এবং আর্থিক প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্য এগিয়ে যাওয়া কঠিন হবে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী এই ক্ষেত্রে একটি বড় সম্পদ। সঠিক নীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা থাকলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকেন্দ্র হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

তবে অর্থনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, নীতির ধারাবাহিকতা এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা শুধু বাজারের আকার দেখেন না; তারা রাষ্ট্রের নীতিগত স্থিরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপরও আস্থা খোঁজেন।

আজকের বিশ্বে কোনো রাষ্ট্র একা এগোতে পারে না। অংশীদারিত্বই ভবিষ্যতের শক্তি। কিন্তু সেই অংশীদারিত্ব হতে হবে জাতীয় স্বার্থভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী। বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ আজও সমান প্রাসঙ্গিক। তবে বর্তমান বাস্তবতায় এই নীতিকে আরও কার্যকর অর্থনৈতিক কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণ নিঃসন্দেহে একটি তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তা। তবে এর প্রকৃত গুরুত্ব নির্ধারিত হবে পরবর্তী পদক্ষেপের মাধ্যমে। বাংলাদেশ যদি এই ধরনের বহুপাক্ষিক মঞ্চকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে এর সুফল শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্থিতিশীলতাও শক্তিশালী হবে।

বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের এই নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশের সামনে সুযোগ যেমন বড়, তেমনি দায়িত্বও কম নয়। আবেগ নয়, বাস্তববাদ; পক্ষপাত নয়, ভারসাম্য; এবং প্রতিযোগিতা নয়, পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সহযোগিতাই হতে পারে আগামী দিনের বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি।

লেখক: সহিদুল আলম স্বপন, সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট ও কবি
ই-মেইল: [email protected]

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন