আউলিয়ায়ে কেরামের মাজার-খানকায় হামলা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও নারী-শিশু নির্যাতনের বিচার এবং জুয়া-মাদক বন্ধের দাবিতে সমাবেশ করেছে সম্মিলিত সুন্নী পীর-মাশায়েখ ফোরাম। শনিবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সুন্নী-পীর মাশায়েখের নেতারা বক্তব্য রাখেন। সমাবেশে বক্তারা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে শুরু হয়ে এখন পর্যন্ত মব সন্ত্রাস অব্যাহত আছে। আউলিয়ায়ে কেরামের মাজার শরীফ ও খানকাগুলোকে টার্গেট করে একের পর এক হামলা ভাঙচুর করা হচ্ছে। এমনকি বহু মাজার-খানকায় অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের ঘটনা ঘটেছে। কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলার মতো ঘটনা ঘটলেও এসবের সঠিক বিচার হয়?নি বলেও দাবি করেন তারা।
তারা বলেন, জনগণের রায়ে প্রতিষ্ঠিত নির্বাচিত সরকারের আমলেও মব সন্ত্রাস এবং মাজার-খানকায় ন্যক্কারজনক হামলা চলছে। যারা এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত, যারা মূল পরিকল্পনাকারী ও ইন্ধনদাতা তাদেরকে গ্রেপ্তার বা আইনের মুখোমুখি করা হচ্ছে না। আমরা এর পরিবর্তন চাই। আইনের শাসন চাই, সত্যিকার বিচার ব্যবস্থার প্রতিফলন চাই।
সমাবেশে সম্মিলিত সুন্নী পীর-মাশায়েখ ফোরাম বিগত দু’বছর যাবৎ দেশব্যাপী আল্লাহর ওলিদের মাজার, খানকায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের সঙ্গে জড়িত সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করে শাস্তি নিশ্চিত করা; ক্ষতিগ্রস্ত মাজার, খানকাহ, দরবারসমূহ যথাযথভাবে পুনর্নির্মাণ ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা; বিগত দু’বছর দেশব্যাপী যে সমস্ত মসজিদের খতিব, মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ শিক্ষকদের জোরপূর্বক ও বেআইনিভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে তাদেরকে অবিলম্বে পুনর্বহাল করা; দেশবিরোধী সকল চুক্তি বাতিল করা; শিশু ও নারী নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা; মদ, জুয়া, গাঁজাসহ সকল প্রকার মাদক দ্রব্যের ব্যবসা, ক্রয়-বিক্রয় সম্পূর্ণ বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ; দেশব্যাপী মব সন্ত্রাস, খুন-খারাবি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতিসহ সকল অপকর্ম বন্ধে সরকারি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা; মাদ্রাসা শিক্ষার স্বকীয়তা রক্ষায় সিলেবাস প্রণয়নে অভিজ্ঞ, দক্ষ ইসলামের মূলধারা সুন্নী মতাদর্শের আলেমদেরকে দিয়ে সিলেবাস প্রণয়ন কমিটি গঠন করা; এনটিআরসিএ’র মাধ্যমে অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপার, সহ সুপার, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, ফকিহ, আদিব, কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়ার প্রজ্ঞাপন বাতিল করে পূর্বের ন্যায় কমিটি কর্তৃক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা; ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গভর্নরসহ বিভিন্ন পদে মসজিদ, গণশিক্ষাসহ সকল নিয়োগ বোর্ডে সুন্নী আলেম ওলামা, পীর-মাশায়েখদের অন্তর্ভুক্ত করা; প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষায় ইসলামী নৈতিক ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করাসহ ১৭টি দাবি তুলে ধরে।
সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের চেয়ারম্যান শাইখুল হাদিস কাজী মুহাম্মদ মুঈন উদ্দীন আশরাফী বলেন, দেশে সরকার পরিবর্তন বা ক্ষমতার পালাবদল হতেই পারে, কিন্তু গত ৫ই আগস্টের পর থেকে মাজার ভাঙার মতো ঘটনা কেন ঘটছে, তার সদুত্তর জাতি জানতে চায়। মাজার বা সুফি-সাধকদের সঙ্গে দেশের কোনো দুর্নীতি বা রাজনৈতিক বিষয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। বাংলাদেশ একসময় বৌদ্ধ ও হিন্দু প্রধান অঞ্চল ছিল, যা আজ বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। এই রূপান্তরের পেছনে কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, বরং সুফি-সাধক ও আউলিয়াদের মূল অবদান ছিল। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশে সব সময় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের প্রতিনিধি হিসেবেই রাষ্ট্রপ্রধানরা দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই যাদের অবদানে এই ইসলাম প্রচার ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত হয়েছে, তাদের মাজার ও স্মৃতিচিহ্নে আক্রমণ সহ্য করা হবে না
তিনি আরও বলেন, সরকারি কারিকুলামে পড়াশোনা না করা সত্ত্বেও অনেকে সরকারি অনুষ্ঠানে গুরুত্ব পেলেও, আলিয়া, ফাজিল ও কামিল মাদ্রাসার অসংখ্য ডক্টরেট ডিগ্রিধারী ও যোগ্য আলেমদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। যারা জাতীয় দিবস কিংবা সরকারি নীতিমালা মানে না, তারা কীভাবে গুরুত্ব পায়? তিনি বলেন, দেশের সব মাদ্রাসা একই আকিদা বা আদর্শের নয়। দেশে সালাফি, কওমি-ওহাবি, মওদুদী ও সুন্নি আকিদার পৃথক পৃথক মাদ্রাসা রয়েছে। কোনো বিশেষ মাদ্রাসায় অনাকাঙ্ক্ষিত বা ঘৃণ্য ঘটনা ঘটলে গণমাধ্যমে ঢালাওভাবে কেবল ‘মাদ্রাসা’ না লিখে সুনির্দিষ্ট আকিদা ও আদর্শের পরিচয় উল্লেখ করা উচিত। অন্যথায় সাধারণ মানুষের মনে সামগ্রিক মাদ্রাসা শিক্ষার প্রতি অনীহা ও ঘৃণার সৃষ্টি হতে পারে।
