নভেম্বর এলেই কর অফিসের সামনে ভোররাত থেকে দীর্ঘ লাইন। হাতে ফাইলভর্তি কাগজপত্র। ভুল ফরম, অনুপস্থিত কর্মকর্তা কিংবা ধীরগতির প্রক্রিয়ায় দিনের পর দিন ভোগান্তি। করদাতাদের কাছে আয়কর রিটার্ন দাখিল ছিল এক ধরনের বার্ষিক দুর্ভোগের নাম। সেই বাস্তবতা বদলে গেছে নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে। এখন একজন করদাতা ঘরে বসেই মোবাইল ফোন বা ল্যাপটপে কয়েক মিনিটে রিটার্ন জমা দিচ্ছেন। সঙ্গে সঙ্গে পেয়ে যাচ্ছেন কর সনদ ও প্রাপ্তি স্বীকারপত্র। এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানসিনেসিস আইটি লিমিটেডের তৈরি ই-রিটার্ন সফটওয়্যার, যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর ডিজিটালাইজেশনে তৈরি করেছে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।
২০২৫-২৬ করবর্ষ থেকে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য অনলাইনে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক করার পর, সিনেসিস আইটির প্ল্যাটফরমে ব্যক্তি করদাতাদের শতভাগ রিটার্ন সম্পন্ন হয়েছে। দেশের কর প্রশাসনের দীর্ঘ ইতিহাসে এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রিটার্ন বাস্তবায়ন। ২০২৬ সালে ই-রিটার্ন সিস্টেমে রিটার্ন জমা পড়েছে ৫০ লক্ষাধিক করদাতার। যার পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা। এটি শুধু একটি সফটওয়্যারের সাফল্য নয়, এটি প্রশাসনিক সংস্কার, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দেশীয় উদ্ভাবনের এক যুগান্তকারী উদাহরণ।
বাংলাদেশে কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশনের চেষ্টা নতুন নয়। গত এক দশকে একাধিক বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এনবিআর কর প্রশাসন আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেয়। প্রতিটি প্রকল্পে ব্যয় হয় শত শত কোটি টাকা। কিন্তু ফলাফল ছিল হতাশাজনক। ২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় কর অফিসে সরাসরি উপস্থিত হওয়া সীমিত হয়ে গেলে লাখ লাখ করদাতার রিটার্ন দাখিল কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ডিজিটাল রূপান্তর আর বিলাসিতা নয়, এটি রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন। এই প্রেক্ষাপটে সম্পূর্ণ ভিন্ন পথ বেছে নেয় এনবিআর। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত একটি রাজস্ব সংস্কার প্রকল্পের আওতায় দায়িত্ব দেয়া হয় দেশীয় প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটিকে। মাত্র প্রায় ১০ কোটি টাকার বাজেটে প্রতিষ্ঠানটি এমন একটি ই-রিটার্ন প্ল্যাটফরম তৈরি করে, যা বহু ব্যয়বহুল বিদেশি প্রকল্পও করতে পারেনি। একটি কার্যকর, স্কেলেবল এবং ব্যবহারবান্ধব ডিজিটাল কর ব্যবস্থা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান বলেন, দেশীয় সফটওয়্যার ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত ইতিবাচক। বাংলাদেশের পাবলিক সেক্টরের বৃহত্তম স্বয়ংক্রিয় আর্থিক ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফরম আইবাস প্লাসের মতোই এনবিআরের ই-রিটার্ন সিস্টেমও তৈরি করেছে দেশীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান।
