চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হন মোহাম্মাদ রানা। পুলিশের ছোড়া গুলিটি ২০ বছর বয়সী এই যুবকের শরীরে আঘাত হানে। এতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। দীর্ঘ চিকিৎসায় এখন কিছুটা স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন খেটে খাওয়া এই যুবক। পিতার অভাবের সংসারে আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যখন রাজধানীসহ সাড়া দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল তখন সাধারণ মানুষের সারিতে রাস্তায় নেমে আসেন তিনি। রানা বলেন, মানুষের ওপর সহিংসতা ও দমন-পীড়নের দৃশ্য তাকে গভীরভাবে আহত করে। এতে তিনি আর ঘরে বসে থাকতে পারেননি। অন্য সবার সঙ্গে তিনিও আন্দোলনে যোগ দেন। রানা জানান, আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হন। পরিবারের নিষেধ সত্ত্বেও আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন রানা। তার ভাষ্য, দমনপীড়নের দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সবাই যখন দাঁড়াচ্ছে, তখন আমিও থাকবো।
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট বিকাল আনুমানিক চারটায় শ্যামলীর ক্লাব মার্টের সামনে তলপেটে গুলিবিদ্ধ হন রানা। মুহূর্তের মধ্যে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আশপাশের মানুষ দ্রুত তাকে উদ্ধার করে শ্যামলীতে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকার চিকিৎসকেরা জানান, তার অবস্থা গুরুতর, উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। এরপর তাকে নেয়া হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে পাঠানো হয় জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে। সেখানে অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকেরা আরও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখান থেকে বাড়ি ফেরেন রানা। কয়েক দফা চিকিৎসার পরও কয়েক মাস ক্ষতস্থানের ব্যথায় ভুগেছেন এই তরুণ। দীর্ঘদিন তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেননি। পেটের ক্ষত পুরোপুরি সারতে প্রায় চার মাস লেগেছে বলে জানান রানা। এ ছাড়া চিকিৎসা খরচ বহন করাও পরিবারের জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। রানা বলেন, মা-বাবা মানুষের কাছ থেকে টাকা এনে চিকিৎসা করিয়েছেন। অনেক সময় ঠিকমতো খেতেও পারিনি। ওষুধ কিনতেও কষ্ট হয়েছে। হাসপাতালে শুয়ে মনে হতো, আমার জন্য পুরো পরিবারটা কষ্ট পাচ্ছে। চিকিৎসার পুরো সময় হাসপাতালে পাশে ছিলেন রানার বাবা মুহাম্মদ ইউনুস। ছোট্ট দোকান সামলে ছেলের চিকিৎসার ব্যয় মেটানো তার জন্য বেশ কঠিন ছিল।
রানার ভাষ্য, দুটি সংগঠন থেকে ৫০ হাজার ও জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে এক লাখ টাকা পান। তবে তার মতে, দীর্ঘ চিকিৎসা ও কর্মহীন সময়ের ক্ষতির তুলনায় এই সহায়তা ছিল সীমিত। বর্তমানে প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডে একটি অফিস বয়ের কাজ করছেন রানা। এই চাকরিই এখন তার পরিবারের অন্যতম আয়ের উৎস। রানা বলেন, অনেক নেতা এসেছেন, অনেক সংগঠনের লোক এসেছেন আমি সহযোগিতায়ও পেয়েছি। কিন্তু এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না। আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না। মানবজমিনকে এই তরুণ আরও বলেন, আমি গুলি খেয়ে হাসপাতালে পড়ে ছিলাম। মা-বাবা কাঁদছিলেন। মানুষের কাছ থেকে টাকা এনে চিকিৎসা করিয়েছেন। এখন দেখি, অনেকেই অনেক দূর চলে গেছেন। আমি শুধু চাই, ভালোভাবে বাঁচতে। এর চেয়ে বেশি চাওয়া আমার নেই।
শ্যামলীর কাজী অফিস মোড়ের ছোট্ট দোকানে বসে ছেলের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রানার মা ফিরোজা বেগম। তিনি বলেন, আমার ছেলে আন্দোলনে গিয়ে গুলি খেয়েছে। হাসপাতালে কতো কষ্ট করেছে, আমরা কতো দৌড়াদৌড়ি করেছি, তা বলে শেষ করা যাবে না। নিজেদের টাকায় চিকিৎসা করিয়েছি। এখন আমি দোকান চালাই আর আমার ছেলে ছোট একটা চাকরি করে। আল্লাহর রহমতে বেঁচে আছে এটাই সবচেয়ে বড় কথা। ছেলের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের বিচার চান ফিরোজা বেগম।
