জামায়াত ফেরেশতাদের দল নয়, অন্যায় আর দল একসঙ্গে চলে না

জামায়াত ফেরেশতাদের দল নয়, অন্যায় আর দল একসঙ্গে চলে না

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী ফেরেশতা-দের দল নয়। আমরা মানুষ, আমাদেরও ভুলত্রুটি হয়। আমরা একটা কথা পরিষ্কার বলেছি, অন্যায় আর জামায়াতে ইসলামী একসঙ্গে চলে না। গতকাল সকালে রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা জেলার ষান্মাসিক সদস্য (রুকন) সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জামায়াত আমীর বলেন, দলের নেতাকর্মীদের ভুলত্রুটি হতে পারে, তবে গুরুতর অন্যায় বা অপরাধের ক্ষেত্রে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, আমাদেরও ভুল, দোষ ও অপরাধ হতে পারে। কেউ যদি আমাদের কোনো অন্যায় দেখেন, তা ধরিয়ে দিন। আমরা সংশোধনের চেষ্টা করবো।

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনার গায়ে যদি সাদা কাপড় থাকে, তাহলে আরও বেশি যত্নশীল হতে হবে। খুব সতর্ক থাকতে হবে। নৈতিকতার প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীতে কোনো ছাড় নেই।

তিনি বলেন, সহনীয় মাত্রার কোনো বিচ্যুতি হলে সংশোধনের সুযোগ দেয়া হবে এবং দায়িত্বে ফেরানোরও চেষ্টা করা হবে। তবে অপরাধের মাত্রা গুরুতর হলে কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না।

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির প্রসঙ্গ তুলে জামায়াত আমীর বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেন অন্যদের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা না করে নিজের মন্ত্রণালয়ের কাজে মনোযোগ দেন।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, উনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) সব বিষয়ে এক্সপার্ট, কিন্তু উনার নিজের মন্ত্রণালয়ের ওপর উনি এক্সপার্ট নন কেন? যার যার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, তাদের পালন করার সুযোগ দিন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব আপনার পালন করার দরকার নেই। উনাকে দায়িত্ব পালন করতে দিন। আপনি আপনার মন্ত্রণালয়ে অ্যাটেনশন দিন। জাতিকে শান্তিতে থাকতে দিন।
দেশে ঘুষ, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ করে জামায়াত আমীর বলেন, আগের দিন এক হুইপকে বলতে দেখেছেন, যেকোনো দেশ থেকেই যেই আসুক, বাংলাদেশে চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে চাঁদাবাজিকে জাতীয়করণ করা হলো কিনা, তা আল্লাহই জানেন।

শফিকুর রহমান বলেন, সদিচ্ছা থাকলে চাঁদাবাজি বন্ধ করা সম্ভব, কিন্তু সদিচ্ছা না থাকলে তা কোনোভাবেই বন্ধ হবে না।

বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বিশ্বের বহু দেশে ছড়িয়ে পড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তবে কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা হস্তক্ষেপ করতে চাই না। প্রতিটি দেশের জনগণই তাদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। একইভাবে অন্য কোনো দেশও যেন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করে।

সীমান্ত পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন, আমাদের শান্তি বিঘ্নিত হলে আপনারাও শান্তিতে থাকতে পারবেন না।

সংবিধান নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, বেশি সংবিধান কচলাতে যাইয়েন না। সংবিধান কচলালে নিজেদের অস্তিত্ব আর খুঁজে পাবেন না। সংবিধানে অনেক কিছু আছে, এখনো হাত দিতে পারেন নাই। হাত দিতে পারবেন কিনা, তাও জানি না।
বিএনপি’র নেতাদের বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে জামায়াত আমীর বলেন, কেউ যদি সংবিধানে নেই বলে গণভোটকে অবৈধ বলেন, তাহলে একই যুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার, গণ-অভ্যুত্থান কিংবা ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনও একই যুক্তিতে অবৈধ হবে।
তিনি আরও বলেন, জনগণ শুধু সংবিধান সংশোধনের নয়, সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সরকার যদি সংস্কারের পরিবর্তে সংশোধনের পথে যায়, তাহলে সেটি হবে ‘মতলবি সংশোধন’, যা জামায়াত মেনে নেবে না।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ কঠিন জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, ৩ থেকে ৫ই আগস্ট সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড হয়েছে। জাতিসংঘ সম্ভাব্য ১ হাজার ৪৫২ জনের মৃত্যুর কথা বললেও কেউ সংখ্যাটা দুই হাজার বা তার কমবেশি বলছে। কারণ, ইন্টারনেট বন্ধ রেখে যাদের হত্যা ও গুম করা হয়েছে, তাদের অনেকের হিসাব পাওয়া যাবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, জামায়াত নিজস্ব উদ্যোগে শহীদদের তালিকা ও প্রোফাইল তৈরির কাজ করছে। এ পর্যন্ত ১২টি ভলিউম সম্পন্ন হয়েছে, ১৩তম ভলিউমের কাজ চলছে।
গণ-অভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করেন জামায়াতের আমীর বলেন, থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন আহত ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করে জেনেছেন, নতুন সরকারের কেউ তাদের দেখতে যায়নি। একইসঙ্গে শহীদ পরিবারের সম্মানী ভাতা না বাড়ানো এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য বাজেটে আলাদা বরাদ্দ না রাখারও সমালোচনা করেন তিনি।

সম্মেলনে ঢাকা জেলা আমীর ও কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মাওলানা মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসাইনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন এমপি, মো. মোবারক হোসাইন এবং কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ঢাকা জেলা সেক্রেটারি মাওলানা মো. আফজাল হোসাইন। এ ছাড়া সম্মেলনে কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ এবং ঢাকা জেলার প্রায় সব পুরুষ ও মহিলা রুকন উপস্থিত ছিলেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন