আমাদের একজন সায়ীদ স্যার

শুভ জন্মদিন

আমাদের একজন সায়ীদ স্যার

ফন্ট সাইজ:

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে আমার পরিচয় কবে? অনেকবার ভাবার চেষ্টা করেছি। স্যারকে নিয়ে আমি কয়েকটি লেখাও লিখেছি। আমার মনে পড়ে আমি যে স্কুলে পড়তাম তার পাশেই ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজ ছিল। সেখানকার একজন শিক্ষক ছিলেন
তিনি। আমাদের স্কুলের মাঠ দিয়ে আড়াআড়ি পথ ধরে বাসায় ফিরতেন। তখন স্যারকে প্রথম দেখি। প্রথম দেখায় তাকে চেনার কারণ টেলিভিশনে তিনি তখন একটি অনুষ্ঠান করতেন। সেই অনুষ্ঠান দেখে স্যারকে চিনতে কোনো সমস্যা হয়নি। আমার যতদূর মনে পড়ে সেটি ছিল সাধারণ জ্ঞানের একটি অনুষ্ঠান। তখন যেহেতু একটাই টেলিভিশন ছিল আর টেলিভিশনে অনুষ্ঠানও কম ছিল; তাই টেলিভিশনে কেউ অংশগ্রহণ করলে সাড়া পড়ে যেতো। সবাই তাকে চিনতো। সেই সুবাদে আমার মনে হয়েছে টেলিভিশনে যে লোকটিকে দেখেছি তাকেই মনে হয় হেঁটে যেতে দেখেছি। সময়ের পরিবর্তনে আমি নিজেও টেলিভিশন ভবনে গিয়েছি। তখন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছে। নানান ব্যাপারে কথাও হয়েছে। কিন্তু আমি সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ হলাম তার ক্লাস করে। যদিও আমি স্যারের সরাসরি ছাত্র ছিলাম না।

আমার বন্ধু ইফতেখারুল ইসলাম, যিনি এক সময় বিদেশি ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। এখন তিনি লেখক, পর্বতারোহী একজন ব্যক্তিত্ব। ইফতেখার ল্যাবরেটরি স্কুলে পড়তেন সেই স্কুলে সায়ীদ স্যার প্রত্যেক ছুটির দিন বক্তৃতা দিতেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি বক্তব্য দিতেন। রুচিবোধ, সম্পর্ক, ছেলেমেয়েদের আদব কায়দা সহ নানান বিষয়। ইফতেখার আমাকে স্যারের বক্তব্য শোনার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। আমি তেমন আগ্রহ দেখাইনি। একদিন শুনলাম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের সঙ্গে ক্লাসে বক্তব্য দিবেন মুস্তাফা মনোয়ার স্যার। এটা শুনে আমিও উৎফুল্ল চিত্তে স্যারের ক্লাসে গিয়েছিলাম। মুস্তাফা মনোয়ার তখন বাংলাদেশ টেলিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার। মুস্তাফা মনোয়ারের দৃষ্টি আকর্ষণ হওয়া মানে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান পাবার ব্যাপারে আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। এই অনুষ্ঠানে যাওয়া মানে তার সঙ্গে আরও কাছাকাছি যেতে পারা, কথা বলার সুযোগ পাওয়া। সেই আশা থেকেই আমি ইফতেখারের সঙ্গে একদিন ক্লাসে গেলাম। মুস্তাফা মনোয়ারের বক্তব্য শুনলাম; তারপর শুনলাম আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের বক্তব্য।

সায়ীদ স্যারের বক্তব্য শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সেই যে স্যারের প্রেমে পড়েছি সেই ভালোবাসা, প্রেম এখনো একই রয়ে গেছে। সম্প্রতি আমি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ক্লাসরুমে গিয়েছিলাম। এক জায়গায় দেখলাম পাঠচক্র আরেক জায়গায় আলোর স্কুল। পাঠচক্রে প্রথম গেলাম। দেখলাম সেখানে একটি বই নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আমি শুনেছি প্রতি শুক্রবারে একটি বই নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে তরুণ আলোচকদের সঙ্গে আমার কথা হলো। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার তার জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য আলোচনার মাধ্যমে খুব সহজ করে বুঝিয়ে দিচ্ছেন ছাত্রছাত্রীদের। সেটা দেখে আমি আবার মুগ্ধ হলাম। ক্লাসটা শেষ করেই স্যার গেলেন আলোর স্কুলে। সেখানেও একইভাবে স্যার বই সম্পর্কে যেভাবে বিশদ বর্ণনা দিলেন আমি শুধু অবাক হয়ে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এই বয়সে স্যার কতো সুন্দর করে বুঝিয়ে দেন। আমি শুধু ভাবতে থাকলাম এতকিছু কীভাবে মনে রাখেন স্যার।
একদিনে এতগুলো ক্লাস কীভাবে নেন সেটাও ভাবনার বিষয়। স্যার আমাকে বললেন, একটু যদি বসো তাহলে মাঝখানে একটি ক্লাস শেষে আমার একটি বক্তৃতা আছে খুব ভালো লাগবে তোমার।

আমি বললাম, আপনার কি আরেকটি ক্লাসে যেতেই হবে?
স্যার বললেন, চলো ক্লাসে না গিয়ে বরং চা খেতে খেতে রবীন্দ্রনাথের গল্প শোনা যাক। বাংলা বইয়ের গল্প, কেন এখনকার ছেলেমেয়েরা ভালো বই পড়তে পারছে না!
রুমে তখন বাজছে শিল্পী নীলুফার ইয়াসমিনের কণ্ঠে কিছু দুর্লভ গান। প্রথমত এই গানগুলো আমার কখনো শোনাই হয়নি। ভাবছিলাম এত সুন্দর গান কার কণ্ঠে! স্যারই বললেন এগুলো নীলুফার ইয়াসমিনের কণ্ঠে গাওয়া। তার খুব ভালো লাগে। বয়সের কারণে এখন কিছু ওষুধ খেতে হয় স্যারের। স্যার ওষুধ খেয়ে নিলেন। আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে স্যারের আর ক্লাসে যাওয়া হলো না। এবার তিনি বক্তৃতা দিতে যাবেন। বক্তৃতার বিষয় কী ছিল আমি জানি না। আমি ধরে নিলাম বক্তৃতার বিষয় ছিল আগ্নেয়গিরি কিংবা প্রশান্ত মহাসাগর! কিন্তু আমার বিষয়টা আমাকে বিস্মিত করে রেখেছে। একজন মানুষ কতোগুলো বিষয় মাথার ভেতর রেখেছেন যে মাত্র তিন ঘণ্টার ভেতর সবগুলো বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। নানারকম জ্ঞান বিতরণ করছেন। আর যারা এগুলো পড়ে এসেছে তারা বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন, স্যার তাদের সেসব প্রশ্নের ঠিক ঠিক উত্তর দিচ্ছেন। কিংবা তারা ভুল করলে সেগুলো ধরিয়ে দিচ্ছেন।
এখনকার বাচ্চারা কিংবা আমি নিজেই একটা টেলিফোন নাম্বার পর্যন্ত মুখস্থ করতে চাই না। আর সেখানে কি পরিমাণ লেখাপড়া করলে বা জ্ঞানচর্চা করলে এতকিছু মাথায় রাখা যায়। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারকে না দেখলে আমার বিশ্বাস করা কঠিন হতো। শুধু কেন্দ্রেই নয় স্যার যখন টেলিভিশন অনুষ্ঠান করেছেন তখন আমি স্যারের খুবই ঘনিষ্ঠ থেকেছি, দেখেছি খুব কাছ থেকে। একটি অনুষ্ঠান করার সময় কি পরিমাণ সিরিয়াস থাকতেন তিনি। আর এই ক্লাসগুলোর কথা বললাম এখানে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলছেন। কোনো নোট নেই। বই হাতে নেই কিন্তু তিনি গড়গড় করে বলে যাচ্ছেন।

তবে টেলিভিশন অনুষ্ঠানের সময় আরেক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে দেখি আমরা। আগে থেকেই পুরো অনুষ্ঠানটি সাজিয়ে নেবেন। কতোটুকু কথা বলবেন সেটারও একটা আইডিয়া নিয়ে রাখবেন। স্ক্রিপ্টের বাইরে তিনি একটা কথাও বলবেন না। যেটা করবেন তিনি সেটা নিখুঁতভাবে করবেন। এমনভাবে তিনি কথা বলবেন যেন তার কথা শুধু শুনতে ইচ্ছে করে। একথা আমি বলছি নাÑ এটা বাংলাদেশের সবাই বলে যে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের কথা শুনতে ভালো লাগে। সেটা বাস্তবে হোক কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় হোক। স্যার একটি কথাই বলেনÑ ‘আমি আলোকিত মানুষ দেখতে চাই’। এই আলোকিত মানুষ দেখার জন্য স্যারের চেষ্টাই কি যথেষ্ট? আমাদের কারও কি কোনো ভূমিকা নেই? দেশ যদি আলোকিত মানুষ পায় তাহলে দেশ এগিয়ে যাবে। সায়ীদ স্যারের শরীরটা এখন বেশি ভালো যাচ্ছে না। কিডনির জটিলতায় ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছে। সেদিন ডাক্তারের চেম্বারে বসেই আমাকে ফোন করে আমার শরীরের খোঁজ নিলেন। নিজের নিউমোনিয়া হলো কিনা চিন্তায় ছিলেন। আমরা চাইÑ ‘স্যার ভালো থাকুন। আলোকিত মানুষ সৃষ্টি অব্যাহত থাকুক। শনিবার স্যারের জন্মদিন। স্যারের জন্মদিনে এটাই প্রত্যাশা’।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন