প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছিল নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটি আধুনিক বিপণিবিতান। প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল পাহাড়ি নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নির্মাণ শেষ হওয়ার আট বছর পরও বান্দরবানের পাঁচতলা জয়িতা ভবনের তালা খোলেনি। কোনো নারী উদ্যোক্তা সেখানে ব্যবসা শুরু করেননি। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় ভবনটি এখন প্রায় পরিত্যক্ত। এর মধ্যেই ভবনটি সংস্কারের জন্য নতুন করে আরও দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, এটি পাহাড়ে উন্নয়নের নামে সরকারি অর্থ অপচয়ের আরেকটি উদাহরণ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করে।
সরকারি নথিতে ভবনটির অবস্থান মেঘলা পর্যটন কমপ্রেক্সের পাশে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এটি বান্দরবান সদর থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে ভাণ্ডারিপাড়ার একটি নির্জন এলাকায় অবস্থিত। শুরু থেকেই স্থান নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন ছিল। নারী উদ্যোক্তা, নারী সমিতি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, অনুপযুক্ত অবস্থানের কারণেই প্রকল্পটি ব্যর্থ হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে ভবনটি ঘুরে দেখা যায়, দরজা-জানালার কাঁচ ভাঙা, ভবনের বিভিন্ন অংশ নষ্ট এবং চারদিকে অযত্নের চিহ্ন। চুরি হয়েছে ভিআইপি কক্ষের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র, আসবাবপত্র ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী। ফুডকোর্ট ও কিডস কর্নারের সরঞ্জামও নেই। নিরাপত্তার অভাবে ভবনের লোহার গ্রিল পর্যন্ত খুলে নেয়া হয়েছে।
ভাণ্ডারিপাড়ার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, এখানে কোনো নারী উদ্যোক্তা কখনো দোকান চালাননি। বছরের পর বছর ভবনটি কুকুর-বিড়ালের আশ্রয়স্থল হয়ে আছে। এখন আবার শুনছি, সংস্কারের জন্য আবার দেড় কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এতে কী লাভ হবে?
পাহাড়ি চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে ভবনটি সংস্কারের জন্য দেড় কোটি টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ‘বান্দরবান সদর উপজেলায় নিবন্ধিত নারী সমিতি ভিত্তিক ব্যতিক্রমী ব্যবসায়ী উদ্যোগ পাঁচতলা নারী বিপণিকেন্দ্র সংস্কার প্রকল্প’ নামে এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫-২৬ থেকে ২০২৭-২৮ অর্থবছর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
বান্দরবান পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড নির্বাহী আবু বিন ইয়াছির আরাফাত জানান, প্রকল্পের টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে তবে এখনো সংস্কার কাজ শুরু হয়নি। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের বান্দরবানের উপপরিচালক সুপন চাকমা জানান, ভবনটিতে ৪৫টি দোকান, দুটি ভিআইপি কক্ষ, একটি ফুডকোর্ট ও একটি কিডস কর্নার রয়েছে। জেলায় নিবন্ধিত ৬৪টি নারী সমিতি এবং প্রায় দুই হাজার নারী উদ্যোক্তা থাকলেও কেউ সেখানে ব্যবসা করতে আগ্রহী নন। তিনি বলেন, ভবনটি চালুর প্রথম বছরে মাত্র আটজন নারী উদ্যোক্তা দোকান বরাদ্দ নিতে সম্মত হয়েছিলেন এবং জামানতও জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু আট বছরেও কেউ দোকানের দখল বুঝে নিতে আসেননি।
নতুন বরাদ্দে ভবনটি চালু করা সম্ভব হবে কি না এ প্রশ্নে সুপন চাকমা বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে তার অভিজ্ঞতায়, বর্তমান অবস্থান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে ভবনটিকে কার্যকর নারী বিপণিবিতান হিসেবে চালু করা কঠিন হবে। এদিকে স্থানীয়দের প্রশ্ন, যে ভবন আট বছরেও একটি দোকানও চালু করতে পারেনি, সেই ভবন সংস্কারে আবার নতুন করে সরকারি অর্থব্যয়ের যৌক্তিকতা কতোটুকু। তাদের দাবি, নতুন বরাদ্দের আগে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা, অবস্থান নির্বাচন এবং বাস্তব সম্ভাব্যতা নিয়ে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
