এখন জেলা জুড়ে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন দৃশ্যমান হচ্ছে। চলমান ৯ই জুলাইয়ে শুরু হওয়া এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় রূপ না নিলেও দ্রুত সময়ের ভয়াবহতায় চরম ক্ষতিগ্রস্তÍ হয়েছেন বন্যাদুর্গতরা। মৌলভীবাজারে হঠাৎ ভারী বৃষ্টি, উজানের ঢলে মনু ও ধলাই নদীর ভাঙন ও প্রতিরক্ষা বাঁধ উপচে প্লাবিত হয় জেলার কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর, মৌলভীবাজার সদরের প্রায় অর্ধশতাধিক গ্রাম। আকস্মিক বন্যায় চরম ক্ষতিগ্রস্তÍ হয় বানের পানিতে প্লাবিত এলাকার ঘরবাড়ি, ক্ষেত কৃষি, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়। নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষ বন্যায় সব হারিয়ে এখন চরম ক্ষতিগ্রস্তÍ। পুনরায় নতুন করে সবকিছু গোছাতে হিমশিম খাচ্ছেন আর্থিক অনটনে থাকা এ সকল হতদরিদ্র মানুষ। বানের পানি দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় রূপ না নেয়াতে দ্রুত ভেসে উঠছে ক্ষত চিহ্ন। নাগরিক সেবায় নিয়োজিত জেলার সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের সংশ্লিষ্টরা ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে মাঠে কাজ করছেন।
ইতিমধ্যে কয়েকটি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে তাদের প্রাথমিকভাবে এ পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিসংখ্যান দিচ্ছেন। জেলা প্রশাসন থেকে জানা যায়, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তÍ বসতবাড়ি ৩৯৩২টি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ২টি তবে অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ হচ্ছে। জেলার কৃষিবিভাগ জানায় বন্যায় জেলায় আউশ ধানের ক্ষতিগ্রস্তÍ জমির পরিমাণ ৮৫.৭ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্তÍ কৃষক ৭৫০ জন। ক্ষতিগ্রস্তÍ ফলন ২৩৯.৯৬ টন (চাল)। যা আর্থিক ক্ষতি ১ কোটি ১৭ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। রোপা আমন বীজতলা ক্ষতিগ্রস্তÍ জমি ৫৫.১ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্তÍ কৃষক ১৭৯৫ জন। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। গ্রীষ্মকালীন সবজি ক্ষতিগ্রস্তÍ জমি ৫৫.৪ হেক্টর। ক্ষতিগ্রস্তÍ কৃষক ১৩৫০ জন। ক্ষতিগ্রস্ত ফলন ৮৮৬.৪০ টন। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৩ কোটি ৫৪ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। জেলা মৎস্য বিভাগ জানায় বন্যায় জেলার ৪০৫টি পুকুরের চাষকৃত মাছের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা। জেলা এলজিইডি সূত্রে জানা যায় বন্যায় জেলার ৫৪টি সড়কের ১৩৭.৮০৮ কি.মি ও ৭টি ব্রিজের ৩৮ মিটার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর্থিক হিসেবে ক্ষতির পরিমাণ ব্রিজ এবং সড়ক মিলে মোট ৬১ কোটি ১২ লাখ টাকা। তিন বিভাগের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, আমরা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করতে মাঠে কাজ করছি। প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা করেছি। আমাদের কাজ চলমান রয়েছে। এদিকে জেলার সরকারি নাগরিক সেবার অন্যান্য দপ্তরগুলোও তাদের ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করছেন। মাঠ পর্যায়ে তার সরজমিন খোঁজখবর ও তথ্য নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
তবে মনু ও ধলা নদীসহ অন্যান্য নদী ও হাওর তীরবর্তী এলাকার হতদরিদ্র অসহায় মানুষগুলো সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত সহযোগিতার প্রত্যাশা করছেন। বন্যায় তাদের সবকিছু হারিয়ে এখন নিঃস্ব। তারা ঘুরে দাঁড়াতে চান। সকলের সহায়তায় আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষগুলো আগের মতো ক্ষেত কৃষি ও শ্রমের মাধ্যমে তারা আয় রোজগার করে পরিবার চালাতে চান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন মানবজমিনকে জানান ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক জাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারেন সে জন্য কৃষি বিভাগ থেকে তাদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে সহযোগিতার জন্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। চাহিদা দেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমনের ক্ষতিগ্রস্ত বীজতলা ও চারার জন্য কিছু সহযোগিতা পাওয়া গেছে। তা শিগগিরই প্রতিটি উপজেলা কৃষি বিভাগের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে তোলে দেয়া হবে।
জেলা এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফারুক আহমদ জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও ব্রিজের তালিকা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমাদের জেলা ও উপজেলার সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী আমাদের বিভাগের ওয়েবসাইটে ছবিসহ আপলোড দিচ্ছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তা প্রত্যক্ষ করছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্যরাও অবগত আছেন। আমরাও চাহিদাপত্র প্রস্তুত করছি। বরাদ্দ পেলে দ্রুত কাজ শুরু করা হবে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ আরিফ হোসেন জানান, বন্যায় মৎস্যচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। আমরা প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিয়ে একটি পরিসংখ্যান প্রস্তুত করেছি এবং তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল মানবজমিনকে জানান, আমরা সকল বিভাগের সমন্বয়ে বন্যা পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে সংশ্লিষ্ট ঊর্র্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছি। যাতে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতা করা যায়। ইতিমধ্যে ঢেউটিন ২শ’ বান্ডিল, নগদ ৫ লাখ ও গৃহমঞ্জুরি ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ এসেছে। আমরা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তÍদের কাছে সরকারের এই সহায়তা পৌঁছে দিবো। তবে এই বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল। আমরা আরও বরাদ্দ পেতে চাহিদা পাঠিয়েছি।
