গাজী নজরুল বহিষ্কার এমপি পদও হারাচ্ছেন?

গাজী নজরুল বহিষ্কার এমপি পদও হারাচ্ছেন?

ফন্ট সাইজ:

ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও প্রকাশের ঘটনায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াত। গাজী নজরুল ইসলাম সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি। দল থেকে বহিষ্কার করায় এখন তার এমপি পদ থাকবে কিনা এই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন দল বহিষ্কার করায় তার এমপি পদ থাকবে না। আবার কেউ বলছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তার এমপি পদ যাবে না যদি না তিনি দুই বছরের বেশি দণ্ডে দণ্ডিত হন। জামায়াত জানিয়েছে দল থেকে বহিষ্কার করার বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে দ্রুতই জানিয়ে দেয়া হবে। দলটির আইনজীবী শিশির মনির জানিয়েছেন, দল বহিষ্কার করায় গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ থাকবে না।

জাতীয় সংসদের একটি সূত্রও একই মত দিয়েছে। তবে সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক মানবজমিনকে জানিয়েছেন, দল থেকে বহিষ্কারের কারণে গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ যাবে না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ যদি ফলো করা হয়। তরুণীর সঙ্গে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর জামায়াতের কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী। পরে প্রথম স্ত্রী, ওই তরুণীর বাবাও বিয়ের বিষয়ে কথা বলেন। নজরুল বিয়ের দাবি করলেও বিয়ের প্রক্রিয়া, তারিখ এবং বিয়ে রেজিস্ট্রেশনের সময় নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ঘটনাপ্রবাহে তথ্য মিলেছে, একটি অপরাধকে চাপা দিতে এমপি আরও অনেকগুলো অনিয়ম করেছেন। মিথ্যা ও প্রতারণার আশ্রয় 
নিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হওয়ায় মঙ্গলবার জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তদন্ত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

দলের প্রাথমিক তদন্তেই গাজী নজরুলের নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পেয়ে তাকে দল থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় জামায়াত। গতকাল দলীয় বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়।
দলের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বুধবার বিকাল ৪টায় রাজধানীর মিন্টু রোডস্থ বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গাজী নজরুলকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্তে তার নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় তাকে গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একইসঙ্গে তাকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে অবহিত করার সিদ্ধান্ত হয়।

এমপি পদের কি হবে?
ওদিকে গাজী নজরুল ইসলামের এমপি পদ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হয়ে কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে (ক) উক্ত পদ দল হতে পদত্যাগ করলে অথবা (খ) সংসদ সদস্য উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করলে, সংসদে তার আসন শূন্য হবে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে যদি ফৌজদারি মামলা হয়। এবং ন্যূনতম দুই বছরের জন্য দণ্ডিত হন, তখন তার এমপি পদ খারিজ হতে পারে। সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, জামায়াত দল থেকে বহিষ্কার করলেও তার এমপি পদের কিছু হবে না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দল থেকে বহিষ্কারের জন্য তার এমপি পদ যাওয়ার কথা নয়। আইনি ব্যাখ্যা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান মানবজমিনকে বলেন, প্রথমে গাজী নজরুল ইসলাম দল থেকে পদত্যাগও করেননি।

এমনকি তিনি কোনো ক্রিমিনাল মামলায় দণ্ডিতও হননি। তাই আইনগতভাবে তার সংসদ সদস্য পদ খারিজ করার সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে তার সদস্যপদ শূন্য হওয়ার কথা না। তবে যেহেতু তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে, এখন তার সংসদ সদস্যপদ শূন্যতার প্রশ্ন দেখা দিলে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬(৪) অনুযায়ী বিষয়টি নিষ্পত্তি করার জন্য নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। ইসি চাইলে তার সদস্যপদ শূন্য করতে পারবে, আবার নাও করতে পারবে। তবে অতীতে দেখা গেছে সংসদের অভিপ্রায় অনুযায়ী ইসি ব্যবস্থা দেন। সংসদ থেকে চিঠি পাঠালে তখন সংবিধানের ৬৬(৪) অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার রহমানেল মাছউদ মানবজমিনকে বলেন, এখনো আমাদের কাছে কোনো চিঠি আসেনি। চিঠি আসলে আমরা আইন অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নিতে পারবো। আসলে নৈতিক স্খলনের কারণে সংদস্য পদ খারিজ হওয়ার কথা নয়। তবে তিনি যদি ক্রিমিনাল কেসে পড়েন, তখন পার্লামেন্ট রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারবেন। স্পিকার যদি মনে করেন তার সংসদ সদস্য পদ থাকা উচিত নয়, তাহলে আমাদের কাছে চিঠি পাঠাবেন। তখন আমরা ব্যবস্থা নিতে পারবো। আপাতত বিষয়টি সংসদের হাতে রয়েছে। এখনো ইসির কাছে আসেনি। সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী চিঠি সংসদ থেকেই আসে। সরাসরি ইসি কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে না। আগে চিঠি আসতে হবে। তারপর আমরা আইনি দিকগুলো যাচাই বাছাই করে পদক্ষেপ নিবো। এর আগে উক্ত বিষয়ে আগাম মন্তব্য করার সুযোগ নেই।

সংবিধানে যা আছে: সংবিধানে সংসদ সদস্যপদ বাতিল-সংক্রান্ত অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলিয়া ঘোষণা করেন, তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর যদি দায় হইতে অব্যাহতি লাভ না করেন, তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন, তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, তিনি যদি প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন সংসদের অনুমতি ছাড়া তিনি যদি একাধিক্রমে ৯০ দিন অনুপস্থিত থাকেন।’

অতীতে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হাজী সেলিম ও কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে দুই বছরের অধিক সাজা হওয়ার পরও তাদের সংসদ সদস্য পদ বহাল ছিল। এমনকি নারী বিদ্বেষী হিটস্পিচ ছড়িয়ে দল থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন আওয়ামী লীগের তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান। তবে তাকে মন্ত্রী পদ থেকে সরিয়ে দিলেও সংসদ সদস্যপদ বহাল রাখা হয়। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য লতিফ সিদ্দিকী ধর্ম নিয়ে চরম বিদ্বেষপূর্ণ কটূক্তি করে দল থেকে বহিষ্কার হলেও তার সংসদ সদস্য পদ বহাল ছিল।

একটি মিথ্যা ঢাকতে গাজী নজরুলের একের পর এক মিথ্যার আশ্রয়: একটি মিথ্যা ঢাকতে একের পর এক নতুন মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে দ্বিতীয় বিয়ের দাবি, পরে কাবিননামায় স্বাক্ষর, আর সেই কাবিননামা ঘিরেই বেরিয়ে এসেছে একের পর এক অসঙ্গতি। কাবিননামা প্রস্তুতকারী কাজী নিজেই স্বীকার করেছেন, এমপি’র ফোনে আগেভাগেই সব তথ্য নথি প্রস্তুত ছিল, আর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরদিন এসে তাতে স্বাক্ষর করেন এমপি, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং কনের বাবা। এদিকে নৈতিক স্খলনের অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করেছে জামায়াতে ইসলামী। ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার নির্বাচনী এলাকা সাতক্ষীরার শ্যামনগরেও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে; বিক্ষোভ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

গাজী নজরুলের দ্বিতীয় বিয়ের দাবি সামনে এলেও, বিয়ে ও কাবিননামা ঘিরে নানা রকম প্রশ্ন তৈরি হয়। এমপি গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, গত ১৭ই জুন তাদের বিয়ে হয়েছে। কিন্তু কোথায় বিয়ে হয়েছে, তা কাবিননামা নিবন্ধনকারী কাজী নিজেই জানেন না। কাজী মাওলানা বিএম বাকী বিল্লাহর ভাষ্য, গত সোমবার রাতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং ঢাকা থেকে ফোনে দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তিনি কাবিননামা প্রস্তুত করেন। কিন্তু সাতক্ষীরার শ্যামনগরের কাজী মাওলানা বিএম বাকী বিল্লাহর সঙ্গে ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর যোগাযোগ করা হয়। এর আগে এমপি নজরুল বিয়ের কাবিননামা, জন্ম সনদসহ সবকিছু প্রস্তুত করে রাখেন। ভিডিও যখন ভাইরাল হয় পরে এসে এমপি ও তার প্রথম স্ত্রী, দ্বিতীয় স্ত্রীসহ সবাই স্বাক্ষর করেন।
কাজী আরও বলেন, বিয়ে কবে ও কোথায় হয়েছে তা তিনি জানেন না। তাকে শুধু জানানো হয়েছিল, ঢাকায় বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে এবং সেটির নিবন্ধন করতে হবে।

ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর পৃথক ভিডিও বার্তায় গাজী নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন এবং মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ একই ধরনের বক্তব্য দেন। তারা জানান, পারিবারিকভাবেই ৩ লাখ টাকা দেনমোহরে মরিয়মের সঙ্গে গাজী নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়েছে এবং বিষয়টি নিয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
ভিডিও ভাইরালের পর আরও একটি মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, একটি কক্ষে গাজী নজরুল ইসলাম ও ওই তরুণীকে কয়েকজন ব্যক্তি ঘিরে রেখেছেন। ভিডিওতে উপস্থিত ব্যক্তিদের বলতে শোনা যায়, জামায়াত হয়ে এই কাজ কীভাবে করলেন?, কয়দিন এনেছেন?, অন্যায় করেছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে গাজী নজরুল ইসলাম মাথা নেড়ে অন্যায় স্বীকার করে বলেন, বিশ্বাস করেন, আজই প্রথম।
একপর্যায়ে মেয়েটির নাম জানতে চাইলে দীর্ঘক্ষণ নীরব থাকার পর তিনি নাম বলেন মাহি। পরে তিনি অনুরোধ করে বলেন, আপনারা ভিডিও ডিলিট করে দেন, সবকিছু বলছি। যাই বলি, আপনারা এটা নিয়েই তো ঝামেলা করবেন। এরইমধ্যে গাজী নজরুল ইসলাম ও মরিয়মের বিয়ের একটি কাবিননামাও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে কনের জন্মতারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ২২শে মে ২০০৮।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন