ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে (এফএসআরইউ) যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সারা দেশে গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। সংকটের ফলে গ্যাস স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন আর অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। দীর্ঘ অপেক্ষা করেও চাহিদামতো মিলছে না গ্যাস। বুধবার রাজধানীর একাধিক সিএনজি স্টেশন ঘুরে এই চিত্র দেখা গেছে। সরবরাহ ঘাটতির কারণে তিতাস গ্যাসের আওতাধীন বেশ কিছু এলাকায় শিল্প, বাণিজ্যিক, সিএনজি ও আবাসিক গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের তীব্র স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। বিশেষ করে শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। একইসঙ্গে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকটে রান্না করতে দুর্ভোগে পড়ছেন অনেকে। চাপ কম থাকায় কোথাও কোথাও চুলা জ্বলছে না। আবার কোথাও কোথাও স্বল্প চাপের কারণে রান্না করতে অনেক সময় লাগছে। তবে সরকার জানিয়েছে এই সংকট সাময়িক। দ্রুতই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
মঙ্গলবার তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ‘মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত তিতাসের আওতাধীন এলাকার সব শ্রেণির গ্রাহক গ্যাসের স্বল্পচাপের মুখে থাকবেন। একই সঙ্গে অন্যান্য গ্যাস বিতরণ কোম্পানির গ্রাহকরাও সরবরাহ সংকটে পড়েছে। ‘দেশে বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে স্বাভাবিক সময়েও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। অর্থাৎ প্রতিদিনই প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুটের ঘাটতি থাকে। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে প্রায় ১৬৫ কোটি ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট। নতুন করে এলএনজি সরবরাহ ৪৫ কোটি ঘনফুট কমে যাওয়ায় গ্যাসের ঘাটতি আরও বেড়েছে।
সরজমিন সিএনজি স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সিএনজিচালিত অটোরিকশা আর ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ লাইন। একেকটি গাড়ি দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে গ্যাসের জন্য। সিএনজি ও ব্যক্তিগত গাড়ি আলাদা আলাদা লাইন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। চালকরা জানান, তাদের কেউ কেউ একাধিক স্টেশন ঘুরে গ্যাস পাননি। কেউ দীর্ঘ লাইন দেখে সংশ্লিষ্ট স্টেশনে ঘুরে অন্য স্টেশনে গিয়েও লাইনে অপেক্ষা করে গ্যাস নিতে হয়েছে। তবে, ভোরবেলায় যে চালকরা গ্যাস নেয়ার জন্য আসেন, তাদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি বলে জানান তারা। স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, গ্যাসের চাপ অনেক কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
অনুদিপ সিএনজি স্টেশনে গ্যাস নিতে এসেছিলেন সিএনজি অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ রনি। তিনি মানবজমিনকে বলেন, খিলক্ষেত ঘুরে মহাখালীতে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম গ্যাস নিতে। সেখানে বন্ধ করে দিলো, পরে শেরাটনের সামনে ঘুরে আসলাম, সেখানেও পাইনি গ্যাস। এখন অনুদিপে আসলাম। এখানে এসে দেখি এত বড় সিরিয়াল যে আজ নেয়া যাবে কিনা সন্দেহ। এখানে না পেলে আর কোথায় যাবো? গতকালও তিন ঘণ্টা ঘুরেছি এই পাম্প থেকে ওই পাম্পে। একই পাম্পের জহির নামের আরেকজন চালক বলেন, আজ সকাল ৯টা থেকে চেষ্টা করছি গ্যাস নেয়ার। দুপুর পর্যন্ত জমা-ই উঠেনি গ্যাসের পেছনে ছুটতে ছুটতে। ১১শ’ টাকা জমা দিতে হবে, নিজের খাবার আছে, পরিবারকে খাওয়াতে হবে। অথচ এখানে গ্যাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হচ্ছে। যমুনা অটো গ্যাস স্টেশনে কার নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন সজীব। দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে তিনি বলেন, অন্তত সাড়ে চার ঘণ্টা অপেক্ষা করছি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ১শ’ মিটার পরিমাণ পথ এগুতে পেরেছি।
অনুদিপ সিএনজি স্টেশনের অপারেশনাল ম্যানেজার আলী আক্কাস চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, মেইন লাইনে গ্যাসের চাপ কম। চাপ যেখানে ১০ থেকে ১৫ থাকার কথা সেখানে চাপ আছে ৪ থেকে ৫। গ্যাসের চাপ খুব কম থাকার কারণে এতগুলো গাড়ি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চাহিদামতো গ্যাস নিতে পারছে না। এবং সময়ও বেশি লাগছে। চালকরা যেখানে ১ হাজার টাকার গ্যাস নেয়ার কথা সেখানে তারা ৩শ’ থেকে ৫শ’ টাকার গ্যাস পাচ্ছে। তিনি বলেন, তিতাস থেকে আমাদের জানিয়েছে, দুই থেকে তিনদিন এই পরিস্থিতি থাকতে পারে।
