তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার অনিয়ম

ফন্ট সাইজ:

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আড়ালে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে রাজধানীর ঢাকা সিটি কলেজ, মোহাম্মদপুরের আল হেরা কলেজ এবং নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসার বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠান তিনটিতে নিয়োগ বিধি লঙ্ঘন, অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ, জাল সনদ ব্যবহারের অভিযোগ, বিধিবহির্ভূতভাবে বেতন-ভাতা গ্রহণ, সরকারি রাজস্ব জমা না দেয়া, ব্যাংকিং বিধি না মেনে নগদ অর্থ ব্যয়, সিটি অ্যালাউন্স গ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের তথ্য পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। এসব অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অনিয়মের অর্থ ফেরত, সরকারি কোষাগারে জমা এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

সম্প্রতি ডিআইএ’র পৃথক পরিদর্শন ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে এসব দুর্নীতি উঠে আসে। বেশি অর্থের অনিয়ম হয়েছে রাজধানীর ঢাকা সিটি কলেজে। বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনিয়মের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, প্রভাষক ও ডেমোনেস্ট্রেটর রয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে শুধু পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সাক্ষাৎকার গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এ ছাড়া নিয়োগ কমিটি গঠন এবং গভর্নিং বডির অনুমোদনের প্রয়োজনীয় নথিও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। ফলে এসব নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ডিআইএ। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালার বাইরে অতিরিক্ত ৩৪ জন অধ্যাপক এবং ৪৭ জন সহযোগী অধ্যাপক কর্মরত রয়েছেন। তারা যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডে বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন।

ডিআইএ’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির প্রায় ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২২৯ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে নগদে ব্যয় করা হয়েছে। আর্থিক বিধি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের আয় ব্যাংক হিসাবে জমা দিয়ে চেকের মাধ্যমে ব্যয় করার নিয়ম থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি। এ ছাড়া ঠিকাদারি কাজ ও বিভিন্ন ধরনের পণ্য কেনার ক্ষেত্রে উৎসে ভ্যাট কর্তন না করায় সরকারের ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ টাকা রাজস্ব ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়েছে। একইসঙ্গে পাবলিক পরীক্ষার সম্মানীর বিপরীতে উৎসে আয়কর কর্তন না করায় আরও ২ লাখ ৯২ হাজার ৬৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ। এ ছাড়াও দীর্ঘ সময় ধরে বিধিবহির্ভূত গভর্নিং বডির সদস্যরা সিটিং অ্যালাউন্স হিসেবে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা গ্রহণ করেছেন। ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে ট্রেজারি চালানের কপি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দাখিলের সুপারিশ করেছে ডিআইএ।

নরসিংদীর আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসাতেও নিয়োগ ও বেতন-ভাতা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের তথ্য পেয়েছে ডিআইএ। সার্টিফিকেট জালিয়াতির উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সহকারী শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাককে ৩৩ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, সহকারী গ্রন্থাগারিক নেছার উদ্দিন আহমদকে ২৮ লাখ ৭৩ হাজার টাকা, জুনিয়র শিক্ষক শামসুন্নাহারকে ১১ লাখ ২১ হাজার টাকা এবং জুনিয়র মৌলভী মানসুরা আক্তারকে ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা ফেরত দিতে বলা হয়েছে। এসব শিক্ষক-কর্মচারীর নিয়োগ ও বেতন-ভাতা গ্রহণের ক্ষেত্রে অনিয়মের তথ্য পাওয়ায় তাদের বেতন বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া স্কেলের বাইরে বেতন নেয়ার অভিযোগে আরবি প্রভাষক জহিরুল হকের কাছ থেকে ৩ লাখ ২ হাজার টাকা, ইসলামের ইতিহাসের প্রভাষক রফিকুল ইসলামের কাছ থেকে ৮৪ হাজার টাকা এবং কৃষি শিক্ষা শিক্ষক রুহুল আমিনের কাছ থেকে ৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ। সবমিলিয়ে সাত শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে মোট ৮৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে।

আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসার বিরুদ্ধে শুধু নিয়োগ ও বেতন-ভাতায় অনিয়ম নয়, জমি নিয়েও অসঙ্গতির তথ্য পেয়েছে ডিআইএ। মাদ্রাসাটির ১ দশমিক ৮২ একর জমি বেহাত হয়েছে। কীভাবে ওই জমি বেহাত হলো এবং এর পেছনে কারা দায়ী, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের কাছে জবাব চাওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মাদ্রাসাটিতে আলিম ও ফাজিল স্তর চালু থাকলেও পর্যাপ্ত শিক্ষার্থী নেই। ফাজিল পর্যায়ে শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ ও অবকাঠামোও নাজুক বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আল হেরা কলেজে আর্থিক লেনদেন ও হিসাব ব্যবস্থাপনায় একাধিক অনিয়মের তথ্য পেয়েছে ডিআইএ। প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা ফি, বেতন, নিজস্ব সম্পদ থেকে আয়, দান ও অনুদানসহ বিভিন্ন ধরনের অর্থ ব্যাংকের মাধ্যমে আদায় করা হয় না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে অনিয়ম হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন