প্লট বরাদ্দের নামে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করে পরবর্তীতে প্লট বুঝিয়ে না দেওয়া এবং গ্রহণকৃত অর্থ ফেরত না দেয়ার অভিযোগে বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ম্যানেজিং ডিরেক্টর) মিজানুর রহমান, চেয়ারম্যান তানিয়া সুলতানা তানভী ও পরিচালক মো. মোমেনসহ স্বার্থ সংশিষ্ট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বুধবার সিআইডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় এবং উক্ত অর্থ বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের তথ্য পাওয়ায় বনানী থানার মামলা হয়। মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা হলেনÑ বেস্টওয়ে ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মিজানুর রহমান (৬১), চেয়ারম্যান তানিয়া সুলতানা তানভী (৪৯) এবং একই প্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. মোমেন (৬৫)। একইসঙ্গে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অভিযোগ আনা হয়েছে।
সিআইডির অনুসন্ধানে জানা যায়, অভিযুক্তরা ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বেস্টওয়েল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের নামে রূপগঞ্জ থানাধীন ভোলাব, তরাইল, বিরাব, মোচারতালুকসহ বিভিন্ন মৌজায় জমি প্লট আকারে কিস্তিতে বিক্রির কথা বলে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্লট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কোম্পানি কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যে তাদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করা হয়। প্লট পাওয়ার আশায় অনেক গ্রাহক বছরের পর বছর কিস্তি ও বিভিন্ন নির্ধারিত মূল্য পরিশোধ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা যায়, অর্থ গ্রহণের পরও অধিকাংশ গ্রাহককে প্রতিশ্রুতি প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও প্লট না পাওয়া এবং জমা দেওয়া অর্থ ফেরত না পাওয়ায় ভুক্তভোগী গ্রহকদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্লট বরাদ্দের নিশ্চয়তা হিসেবে গ্রাহকদের দেওয়া অর্থের বিপরীতে তাদের শুধুমাত্র জিম্মা, গ্যারান্টি বা সিকিউরিটি হিসেবে সাব-কবলা দলিল প্রদান করা হলেও প্রকৃতপক্ষে প্রতিশ্রুতি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
সিআইডি জানায়, পরবর্তীতে প্লট না পাওয়া এবং অর্থ ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে কয়েকজন গ্রাহক সিআইডিতে অভিযোগ করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সিআইডি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ বিধিমালা মোতাবেক দীর্ঘ অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে বেস্টওয়েল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেডের মাধ্যমে প্লট বরাদ্দের নামে অন্তত ৩৭ জন গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে সর্বমোট ৭ কোটি ২ লাখ ৬৭ হাজার ৬০৪ টাকা গ্রাহণ করা হলেও তাদের প্রতিশ্রুতিতে প্লট বুঝিয়ে দেওয়া হয়নি এবং গ্রহণকৃত অর্থও ফেরত দেওয়া হয়নি। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, প্রতারণার মাধ্যমে গ্রাহকদের কাছ থেকে গ্রহণ করা অর্থের একটি বড় অংশ অভিযুক্তদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে জমা, উত্তোলন, স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তর করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত মোট ৮২টি ব্যাংক হিসাবের লেনদেন পর্যালোচনা করে ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা ও উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, উক্ত সময়কালে এসব ব্যাংক হিসাবে মোট ৩৫৯ কোটি ২ লাখ ৭১ হাজার ৯৪৫ টাকা ৭২ পয়সা জমা এবং ৩৫৮ কোটি ৫৪ লাখ ৩৭ হাজার ১০২ টাকা ৭৯ পয়সা উত্তোলনের মাধ্যমে বিভিন্নভাবে স্থানান্তর , হস্তান্তর ও রূপান্তর করা হয়েছে।
এ ছাড়াও অনুসন্ধানে ২০১০ সালে ১ হাজার ১৮৮টি, ২০১১ সালে ৯৫৩টি, ২০১২ সালে ২৭৪টি, ২০১৩ সালে ১৯৬টি এবং ২০১৪ সালে ১০২টিসহ সর্বমোট ২ হাজার ৭১৩টি জিম্মা, গ্যারান্টি বা সিকিউরিটি হিসেবে প্রদত্ত সাব-কবলা রেজিস্ট্রি দলিলের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব নথিপত্র ও আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণে প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে স্থানান্তর ও রূপান্তরের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া যায়।
সিআইডি কোনো আবাসন প্রকল্পে প্লট বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, জমির মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন, ভূমির কাগজপত্র এবং অর্থ লেনদেনের বৈধতা যথাযথভাবে যাচাই করে বিনিয়োগের ব্যাপারে জনগণকে সতর্ক থাকার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। এছাড়াও কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে প্রলোভর পড়ে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ছাড়া অর্থ প্রদান না করার জন্যও সকলের প্রতি অনুরোধ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে প্রতারণা, অবৈধ অর্থ লেনদেন বা মানিলন্ডারিং সংক্রান্ত কোনো তথ্য জানা থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবহিত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
