অবশেষে মাঠে গড়াচ্ছে কমনওয়েলথ গেমসের এবারের আসর। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে রাত ১টায় ওভো হাইড্রো ইনডোর অ্যারেনায় জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে শুরু হচ্ছে ৭০টিরও বেশি কমনওয়েলথভুক্ত দেশের এই ক্রীড়াযজ্ঞ। টুর্নামেন্টের প্রথম দিন মাঠে গড়াবে থ্রি-অন-থ্রি বাস্কেটবল, লন বোলস, বক্সিং ও সাঁতার। ২রা আগস্ট সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে শেষ হবে এই আসর। ২০২২ সালের শেষদিকে অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যকে আয়োজক হিসেবে চূড়ান্ত করা হলেও ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কায় ৯ মাসের মাথায় সরে দাঁড়ায় তারা। এরপর ২০২৪ সালের অক্টোবরে নতুন আয়োজক হিসেবে সামনে আসে গ্লাসগো, তবে শর্ত হিসেবে আসরের পরিসরও যথেষ্ট ছোট করে আনতে হয়।
এবারের আসরে মোট ডিসিপ্লিন মাত্র ১০টি। অ্যাথলেটিকস ও প্যারা অ্যাথলেটিকস, সাঁতার ও প্যারা সাঁতার, আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিকস, ট্র্যাক সাইক্লিং ও প্যারা সাইক্লিং, নেটবল, ওয়েটলিফটিং ও প্যারা পাওয়ার লিফটিং, বক্সিং, জুডো, লন বোলস ও প্যারা বোলস এবং থ্রি-অন-থ্রি বাস্কেটবল ও থ্রি-অন-থ্রি হুইলচেয়ার বাস্কেটবল। আগের আসরে থাকা ক্রিকেট, হকি ও রাগবি সেভেনসের মতো জনপ্রিয় ইভেন্ট এবার নেই। কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল অস্ট্রেলিয়া। গ্লাসগোতে নামার আগে তাদের ঝুলিতে আছে ১ হাজার ১টি স্বর্ণসহ মোট ২ হাজার ৫৯৬টি পদক। এখন পর্যন্ত হওয়া ২১ আসরের ১৩টিতে তারা চ্যাম্পিয়ন। তবে এবার সেরা তারকাদের ছাড়াই টুর্নামেন্টে অংশ নেবে অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বসেরা স্প্রিন্টার গাউট মৌসুম-শেষ চোটে ছিটকে গেছেন প্রতিযোগিতা থেকে।
পাঁচবারের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু কেইলি ম্যাককিওনও গ্ল্যান্ডুলার জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গেমস থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেন। এই বৈশ্বিক আয়োজনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণও এবার সীমিত। মোট ১০ ডিসিপ্লিনের মধ্যে মাত্র চারটিতে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। অ্যাথলেটিকস, বক্সিং, জিমন্যাস্টিকস ও সুইমিং। প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৫ সদস্যের বহর পাঠানো হলেও তার মধ্যে প্রকৃত ক্রীড়াবিদ মাত্র ১৫ জন। বাকিরা কোচ, কর্মকর্তা ও ফেডারেশন প্রতিনিধি। দেশ ছাড়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশনের মহাসচিব জোবায়েদুর রহমান রানা নিজেদের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এবারের আসরে শুটিং নেই, আরচারিও নেই। তাই আমরা ভালো ফলের প্রত্যাশা না নিয়েই যাচ্ছি গ্লাসগোতে।’ প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মাত্র আড়াই মাসের অনুশীলন। তা ছাড়া ক্রীড়া স্থাপনার অভাবও রয়েছে। এমনও হয়েছে, এক ভেন্যুতে সময় ভাগ করে চারটি ডিসিপ্লিনকে অনুশীলন করাতে হয়েছে।’ কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে মহাসচিবের এই হতাশা আরও স্পষ্ট হয়।
১৯৭৮ সালে প্রথমবার অংশ নেয়ার পর এ পর্যন্ত মোট আটবার এই আসরে খেলেছে বাংলাদেশ। জিতেছে সর্বমোট ৮টি পদক। ২টি স্বর্ণ, ৪টি রৌপ্য ও ২টি ব্রোঞ্জ। এই আটটি পদকের প্রতিটি এসেছে শুটিং থেকে। ১৯৯০ সালে অকল্যান্ডে আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তারের জোড়া পদক (স্বর্ণ ও ব্রোঞ্জ) দিয়ে শুরু, এরপর ২০০২ সালে ম্যানচেস্টারে এয়ার রাইফেলে বাংলাদেশকে প্রথম এককভাবে স্বর্ণ এনে দেন আসিফ হোসেন খান। পরবর্তীতে ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের আসরেও শুটিং থেকেই আসে একের পর এক পদক, যেখানে আসিফ হোসেন খান ও আবদুল্লাহেল বাকি- দু’জনই তিনটি করে পদক জিতে বাংলাদেশের যৌথভাবে সর্বোচ্চ সফল ক্রীড়াবিদ। কিন্তু ২০২২ সালের বার্মিংহাম আসরে খালি হাতে ফেরার পর এবার গ্লাসগোতে সেই একমাত্র ভরসার জায়গা শুটিংই নেই আসরে।
উদ্বোধনী দিনের মার্চপাস্টে বাংলাদেশের পতাকা বহন করবেন সাঁতারু সামিউল ইসলাম রাফি, আর ব্যাটন রিলেতে থাকবেন আরেক সাঁতারু সোনিয়া আক্তার। এ প্রসঙ্গে মহাসচিব রানা বলেন, ‘যেহেতু অ্যাথলেট দল উদ্বোধনের পর যাবে, তাই দু’টিই সাঁতারুরা বহন করবে।’ বক্সিংয়ে নারী বক্সার জিনাত ফেরদৌসের পাশাপাশি ৫৫ কেজিতে রাকিব হোসেন ও ৬০ কেজিতে রুহিন রেজা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। অ্যাথলেটিকসের পাঁচ ইভেন্টে অংশ নেবেন পাঁচজন অ্যাথলেট। ১০০ মিটারে নৌবাহিনীর ইমরানুর রহমান ও শিরিন আক্তার, ৪০০ মিটারে সেনাবাহিনীর লুশাদ ইসলাম ও নাজিমুল ইসলাম এবং মেয়েদের লংজাম্পে নৌবাহিনীর স্বপ্না খাতুন। সুইমিংয়ে পুলে নামবেন- সামিউল ইসলাম রাফি, সোনিয়া আক্তার, কাজল মিয়া ও সুকুমার রাজবংশী। জিমন্যাস্টিকসে কসরত দেখাবেন শিশির আহমেদ, রাজিব চাকমা ও আবু সাঈদ রাফি। এবারের আসরে বাংলাদেশের সামনে পদকের সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। তবে ক্রীড়াঙ্গনের যেকোনো বড় আসরই তরুণ ক্রীড়াবিদদের জন্য অভিজ্ঞতা অর্জনের এক দুর্লভ সুযোগ। গ্লাসগোর এই আসর থেকে বাংলাদেশ তাই পদকের চেয়ে বেশি মনোযোগী থাকবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনে।
