খাগড়াছড়ির সুবিধাবঞ্চিত তিন কিশোরীর অদম্য যাত্রা

খাগড়াছড়ির সুবিধাবঞ্চিত তিন কিশোরীর অদম্য যাত্রা

ফন্ট সাইজ:

সুবিধাবঞ্চিত তারা। নেই বাবা-মা। খাগড়াছড়িতে অবস্থিত সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনস্থ প্রতিষ্ঠান সরকারি শিশু পরিবার মিশ্র খাগড়াছড়িতে তাদের বেড়ে ওঠা। সেখান থেকেই নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের মঞ্চ কাঁপাচ্ছেন তিন বান্ধবী। তিনজনই এখন চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রিকেট দলের প্রতিনিধি। কুমিল্লাকে হারিয়ে চট্টগ্রামকে সেমিফাইনালে তোলার অন্যতম কারিগর তারা।

একদিন বিকালে হোস্টেলের সামনে টেপ টেনিস ক্রিকেট দিয়েই শুরু তিন বান্ধবীর যাত্রা। বড় আপুদের খেলতে দেখে জেগেছিল ইচ্ছা- বড় হয়ে তারাও একদিন ক্রিকেট খেলবে। সেই স্বপ্ন থেকেই প্রতিদিন বিকালে অনুশীলন। এরপর নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের ডাক আসতেই খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে গিয়ে প্রথমবার হাতে উঠে এলো ক্রিকেট বল।

তিন বান্ধবীর একজন অপু ত্রিপুরা। বয়স ১৩, পড়ছেন সপ্তম শ্রেণিতে। ব্যাটিং আর ফিল্ডিং তার প্রিয়। মাঝেমধ্যে বল হাতেও দেখা যায় তাকে। প্রথমবার ক্রিকেট ব্যাট আর বল হাতে নেয়ার অনুভূতি এখনো তার মনে টাটকা। অপু বলেন, ‘টেপ টেনিস বল দিয়ে বল করতে সহজ লাগতো। কিন্তু আসল ক্রিকেট বল হাতে নিয়ে প্রথমে মনে হয়েছিল, এত ভারী বল দিয়ে খেলতে পারবো না। হাতে লাগলে ব্যথাও লাগতো। পরে স্যার শিখিয়ে দিলেন কীভাবে হাতে বল ধরে ঘুরিয়ে বল করতে হয়। আস্তে আস্তে সহজ হয়ে গেল।’ চট্টগ্রামের সেমিফাইনাল জয়ে উচ্ছ্বসিত অপু। তার ভাষায়, ‘সেমিফাইনাল জিতে অনেক খুশি লাগছে। এখন ফাইনাল জিতে ঘরে ফিরতে চাই।’ প্রিয় ক্রিকেটার কে জানতে চাইলে এক মুহূর্ত না ভেবেই বলেন লিটন দাসের নাম। অপুর কথায়, ‘লিটন দাসকে খেলতে দেখে আমার মনে হয়েছিল, আমিও উনার মতো খেলবো। উনাকে আমার অনেক ভালো লাগে।’

অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সীমা লতা ত্রিপুরার পরিচয় দলের স্পিন বোলার হিসেবে। ডান হাতে বল ঘুরিয়ে ব্যাটসম্যানদের বিভ্রান্ত করাই তার কাজ। ক্রিকেট বল প্রথমবার হাতে নেয়ার স্মৃতিচারণ করে সীমা বলেন, ‘টেপ টেনিসে বল করা সহজ ছিল। প্রথমবার আসায় ক্রিকেট বল হাতে নিয়ে একটু ওজন বেশি লেগেছিল। কিছুদিন অনুশীলনের পর কোচ আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ঠিকমতো বল করতে হয়।’

হোস্টেলে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ নেই। তাই ইউটিউবে ক্রিকেটের টিউটোরিয়াল দেখার সুযোগও হয় না সীমার। এই আক্ষেপ তার মনে থেকেই যায়। সীমা বলেন, ‘মাঝেমধ্যে টিভিতে খেলা দেখি। ফোন তো ব্যবহার করা যায় না।’ তবু টিভির পর্দাতেই খুঁজে নিয়েছেন আদর্শ। টাইগার ব্যাটার লিটন দাস। সীমার ভাষায়, ‘লিটন দাসের খেলা আমার ভালো লাগে। উনি কী দারুণ ব্যাটিং করেন!’

তিন বান্ধবীর মধ্যে সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় পায়মাফ্রো মারমা। বয়স ১৩, পড়ছেন সপ্তম শ্রেণিতে। ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই সমান স্বচ্ছন্দ এই অলরাউন্ডার। উপজেলা পর্যায়ের টুর্নামেন্টে তিন ম্যাচেই রেখেছিলেন উইকেট শিকারের ছাপ। ফাইনালে ব্যাট হাতে খেলেন ৩০-ঊর্ধ্ব ইনিংস। সেই পারফরম্যান্সের সুবাদেই ব্যাটিং ও বোলিং- দুই বিভাগেই পুরস্কার উঠেছিল তার হাতে। চট্টগ্রামের সহকারী কোচ বলেন, ‘ব্যাটিংয়ে সব পুরস্কার একাই পেয়েছে ও।’

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের সুবাদে প্রথমবার খাগড়াছড়ি স্টেডিয়ামে যাওয়া, আর সেখানেই কোচ আলামিনের হাত ধরে পেশাদার প্রশিক্ষণের শুরু। টেপ টেনিস বল ছেড়ে আসল ক্রিকেট বলের সঙ্গে পরিচয়- এই মোড়টাই বদলে দিয়েছে তিন বান্ধবীর ক্রিকেট যাত্রা। এরপর একে একে বিভাগীয় প্রতিযোগিতা, রানার্সআপের মুকুট আর এখন জাতীয় পর্যায়ে সেমিফাইনালের মঞ্চ। সুবিধাবঞ্চিত জীবনের গণ্ডি পেরিয়ে মাঠে নিজেদের চেনানো তিন কিশোরীর চোখে এখন একটাই স্বপ্ন- ফাইনাল জিতে ঘরে ফেরা।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন