বিশ্বে টিকে থাকতে মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই

বইমেলা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

বিশ্বে টিকে থাকতে মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই

ফন্ট সাইজ:

বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধি ও সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এজন্য জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও মেধায় নিজেদের সমৃদ্ধ হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল বিকালে বাংলা একাডেমিতে অমর একুশে বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তারেক রহমান বলেন, বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজে এই সময় মাতৃভাষা ছাড়াও আরও একাধিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধি এবং সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার মনে হয় বিকল্প নেই আমাদের সামনে। এজন্য আমাদের জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে ও মেধায় নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করে সমৃদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আমাদের মনে হয় কাজ শুরু করা প্রয়োজন।

অমর একুশে বইমেলাকে আগামীতে আন্তর্জাতিক বইমেলা হিসেবে আয়োজন করা যায় কিনা তা ভেবে দেখার জন্য সকলের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ৫২-এর ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আমরা স্বগৌরবে প্রতিবছর একুশ পালন করে থাকি। দিবসটি এখন শুধু আর বাংলাদেশের নয়, অমর একুশে এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারা বিশ্বেই পালিত হচ্ছে। ভাষা আন্দোলনের শহীদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে আজকের এই স্থানটি অর্থাৎ এই বাংলা একাডেমি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলা একাডেমির সৃজনশীল কার্যক্রমের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ অমর একুশে বইমেলা। তবে সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী বছরগুলোতে অমর একুশে বইমেলা আন্তর্জাতিক বইমেলা হিসেবে আয়োজন করার সুযোগ রয়েছে কিনা সেটি আমি আপনাদের সকলকে ভেবে দেখার অনুরোধ জানাবো। অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হলে বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বহু ভাষা এবং সংস্কৃতি শেখা-জানা এবং বোঝার দিকে আমাদের নাগরিকদের আগ্রহী করে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমি বিশ্বাস করি বা মনে করি।

বইমেলা হয়ে উঠুক প্রাণের মিলনমেলা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদ মুক্ত বাংলাদেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার তার যাত্রা শুরু করেছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়। বইমেলা কেবল বই বেচা- কেনার মেলা নয়। বরং এই মেলা হয়ে উঠুক শিক্ষা এবং সংস্কৃতি বিকাশের সূতিকাগার। অমর একুশে বইমেলা কেন্দ্র করে বাংলা একাডেমি মাসব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠান সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন, সংগীত-আবৃত্তি প্রতিযোগিতা যে আয়োজন করে এসব উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের সামনে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি করে দেয়।

বইমেলা সারা দেশে করতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অমর একুশে বইমেলা শুধু একটি নির্দিষ্ট মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহ্‌রাওয়ার্দী উদ্যানে সীমাবদ্ধ না রেখে বরং সারাবছর দেশের সব বিভাগ জেলা ও উপজেলায় আয়োজন করা যেতে পারে। এ ব্যাপারে বই প্রকাশকরা উদ্যোগী হয়ে ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আমি মনে করি এবং সরকারের পক্ষ থেকে যদি সহযোগিতার কোনো অবকাশ থাকে অবশ্যই বর্তমান সরকার সেখানে এগিয়ে আসবে। একই সঙ্গে এ ব্যাপারে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় আপনাদেরকে নিশ্চয়ই প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছেন।

তিনি বলেন, জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি আমাদের তরুণ-তরুণীদের মেধা ও মনন বিকাশের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন মেয়াদি গবেষণাবৃত্তি, তরুণ লেখক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন, এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও দেশজ সংস্কৃতির মূল ধারার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা ভবিষ্যতে আরও সমপ্রসারিত হবে ইনশাআল্লাহ্‌। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাহিত্য, ইংরেজিসহ নানা বিদেশি ভাষায় অনুবাদের কার্যক্রম বাংলা একাডেমি পরিচালনা করছে। আমি দৃঢ়ভাবে আশা করি, এ কার্যক্রম আরও বেগবান হবে ইনশাআল্লাহ্‌ এবং আমাদের সমৃদ্ধ সাহিত্যের সঙ্গে বিশ্বসাহিত্যের পরিচয় আরও দৃঢ় হবে ইনশাআল্লাহ্‌। এজন্যই আমরা বলি সবার আগে বাংলাদেশ। এই দেশকে সকল প্রকার অন্ধকার ও পশ্চাৎপদতা থেকে মুক্ত করে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য একটি নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে আমি আপনাদের সকলের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করছি।

তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সময়ে তথ্যপ্রযুক্তি মানুষের বই পড়ার অভ্যাসে মনে হয় প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে খুব সম্ভবত বই বিমুখ করে তুলছে ধীরে ধীরে, ইন্টারনেটে অবশ্যই বই পড়া যায়। তবে গবেষকরা বলছেন বইয়ের পাতায় কালো অক্ষরে লেখা বই পড়ার মধ্যে যে জ্ঞানের গভীরতা উপভোগ করা যায়, সম্ভবত একইদিন একইভাবে দিনের পর দিন কম্পিউটারের মনিটরে ডুবে থেকে জ্ঞান অর্জন হয়তো সম্ভব। তবে শরীরে এবং মনোজগতে এর একটা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার প্রভাব রয়ে যায়। যুক্তরাজ্য কিংবা কানাডার মতন অনেক উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা বলছেন, ইন্টারনেট ব্যবহারের আসক্তি পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলার তীব্র ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সময়ের প্রেক্ষিতে জনজীবনে ইন্টারনেট হয়তো অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠলেও এর নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে আমাদেরকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে, এ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন বোধহয়। বিশেষ করে বইয়ের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ানোর উপায় আমাদেরকে বের করতে হবে।

অমর ২১শে বইমেলা শুধুমাত্রই একটি নিছক উৎসবই বোধ হয় মনে করা ঠিক হবে না। বরং এই মেলা আমাদেরকে আরও কীভাবে বইপ্রেমী করে তুলতে পারে, সেটি নিয়েও আমাদের কাজ করার অবকাশ রয়েছে। সকলকে নিয়মিত বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলবে আজকের এই বইমেলায় দাঁড়িয়ে এটি আমরা সকলে প্রত্যাশা করতে পারি।

অনুষ্ঠানে বাংলা একাডেমির সাহিত্য পুরস্কার-২০২৫ প্রাপ্তগণ সাহিত্যে নাসিমা আনিস, প্রবন্ধ-গদ্যে আজিজুল হক, শিশুসাহিত্যে হাসান হাফিজ, অনুবাদে আলী আহমদ, গবেষণায় মুস্তফা মজিদ ও ইসরাইল ও মুক্তিযুদ্ধে মঈনুল হাসানের হাতে পদক, সম্মাননাপত্র, সন্মাননা স্মারক, তিন লক্ষ টাকার চেক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, সংস্কৃতি সচিব মফিদুর রহমান, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম, পুস্তক প্রকাশক সমিতির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যগণ, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবিসহ নাগরিকগণ উপস্থিত ছিলেন। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ সংস্কৃতিমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে বাংলা একাডেমি বইমেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং বেশ কিছু বই সংগ্রহ করেন।

৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যান্ড দলকে একুশে পদক দিলেন প্রধানমন্ত্রী

এদিকে সকালে রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ৯ বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ব্যান্ড দলের মনোনীত প্রতিনিধির হাতে একুশে পদক তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ তাদের হাতে তুলে দেন।

এ বছর একুশে পদক পেয়েছেন- চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ফরিদা আক্তার ববিতা, চারুকলায় অধ্যাপক মো. আবদুস সাত্তার, স্থাপত্যে মেরিনা তাবাস্‌সুম, সংগীতে আইয়ুব বাচ্চু (মরণোত্তর), নাট্যকলায় ইসলাম উদ্দিন পালাকার, সাংবাদিকতায় শফিক রেহমান, শিক্ষায় অধ্যাপক মাহবুবুল আলম মজুমদার, ভাস্কর্যে তেজস হালদার যশ এবং নৃত্যকলায় অর্থী আহমেদ। এ ছাড়া জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘ওয়ারফেজ’ সংগীত দল হিসেবে পুরস্কার পেয়েছে।

মরণোত্তর পুরস্কারপ্রাপ্ত আইয়ুব বাচ্চুর পক্ষে তার স্ত্রী ফেরদৌস আখতার চন্দনা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন। আর ওয়ারফেজের পক্ষে দলনেতা শেখ মনিরুল আলম পুরস্কার নেন।

সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন- সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম। স্বাগত বক্তব্য দেন- সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান। এছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণি পুরস্কারপ্রাপ্তদের নাম ও গুণগত অবদান পাঠ করে শোনান এবং পদক প্রদান পর্ব সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন