বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায় রদবদলের গুঞ্জনের বিষয়টি খোলাসা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যদি মনে করেন, মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য ভালো ‘পারফর্ম’ করতে পারছেন না, তাহলে তার জায়গায় দপ্তর পুনর্বণ্টন অথবা নতুন কাউকে দায়িত্ব দেবেন। তবে এটি সরকারের ১৮০ দিনের পর, নাকি আরও সময় লাগবে, সেটা নিশ্চিত নয়। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য জানাতে আয়োজিত নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় ২৪ জন পূর্ণমন্ত্রী ও ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন। এ ছাড়া মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় ১০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন। সরকারের ১৮০ দিনের মধ্যে মন্ত্রিসভায় কোনো রদবদল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে কিনা- সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী একটি মন্ত্রিসভা তৈরি করেছেন। একটি উপদেষ্টা পরিষদ তৈরি করেছেন। যেটুকু উনার (প্রধানমন্ত্রী) সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে আমি বুঝি, উনার (প্রধানমন্ত্রী) যদি কখনো মনে হয়, কেউ ভালো পারফর্ম করতে পারছেন না, তার জায়গায় দপ্তর পুনর্বণ্টন অথবা নতুন কাউকে দেয়া, এগুলো যদি প্রয়োজন হয়, সেটা তিনি করবেন। কারণ, দিন শেষে জনগণের কল্যাণ সাধন করা... প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার কোনো চয়েস বা সিদ্ধান্ত আরও বেটার করার সুযোগ যদি থাকে, তিনি সেটা করবেন। তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলে এটা মনে হয়েছে। এটা এখন ১৮০ দিনের পরপর হবে, নাকি তার চেয়ে একটু সময় লাগবে, এটা এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না।’
সাইবার বুলিং ও অপতথ্য রোধে আইনগত বিষয় দেখভালের জন্য একটি আইনজীবী প্যানেল গঠন করা হচ্ছে জানিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, ডিপফেক, ভুয়া তথ্য (ডিসইনফরমেশন), মিথ্যাচার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এসব অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে বিশেষ আইনজীবী প্যানেল গঠনের সব প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি বাকি রয়েছে, যা আগামী দুই-একদিনের মধ্যেই প্রকাশ করা হবে। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ডিপফেক, মিথ্যাচার ও সাইবার বুলিং কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
ডা. জাহেদ বলেন, সরকার শুরু থেকেই তথ্যের অপব্যবহার, বিশেষ করে ডিসইনফরমেশন এবং সাইবার বুলিংকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। তিনি বলেন, বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তারের ফলে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে দেয়া, মানুষের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো, ছবি ও ভিডিও বিকৃত করে প্রচার করা এবং ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এসব কর্মকাণ্ড শুধু ব্যক্তির সম্মানহানি ঘটাচ্ছে না, বরং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি এবং মানুষের নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠছে। তথ্য উপদেষ্টা বলেন, বিশেষ করে নারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। শুধু নারী হওয়ার কারণেই অনেককে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অপমান, হুমকি, কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য এবং মিথ্যা প্রচারণার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই আইনজীবী প্যানেল শুধু অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেবে না, প্রয়োজন হলে স্বপ্রণোদিত হয়েও আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারবে। সরকার যেসব ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে, সেসব ক্ষেত্রেও প্যানেলটি সক্রিয়ভাবে কাজ করবে। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সাধারণ নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের দ্রুত সহায়তা প্রদান করা।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক কার্যক্রম সম্পর্কেও তথ্য তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান জানান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২০শে জুলাই পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২৫ সালের একই সময়ে যেখানে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৭ হাজার ২১৮ জন, সেখানে ২০২৬ সালের একই সময়ে আক্রান্ত হয়েছেন ১০ হাজার ৮৫৭ জন। একইভাবে মৃত্যুর সংখ্যাও কমেছে। গত বছর একই সময়ে ডেঙ্গুতে ৬২ জনের মৃত্যু হলেও এবার মৃত্যু হয়েছে ৩৭ জনের।
জ্বালানি খাতের অগ্রগতির বিষয়ে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানির জন্য ৪০টি প্রতিষ্ঠানের তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ১৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনার মধ্যে ইতিমধ্যে ২৯টি কূপ খনন করা হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রায় ২৭০ দশমিক ৮ মিলিয়ন এমএমসিএফটি গ্যাস উৎপাদন নিশ্চিত হয়েছে এবং এর মধ্যে ১২৫ দশমিক ৩ এমএমসিএফটি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বাকি কূপগুলো খনন করে আরও প্রায় ১ হাজার ৪৯১ এমএমসিএফটি গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, দেশে গ্যাসের সম্ভাব্য মজুত যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা গেলে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ তুলে ধরে জাহেদ উর রহমান বলেন, আগামী আগস্টের মাঝামাঝি পরীক্ষামূলকভাবে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালু করা হবে। প্রথম পর্যায়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের মাধ্যমে এই ডেবিট কার্ড দেয়া হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০ হাজার এবং আগামী বছরের জুনের মধ্যে দুই লাখ প্রবাসীর হাতে এই কার্ড পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য রয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে এর কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা অন্তত ১০ ধরনের সেবা সহজে পাবেন বলে জানান তিনি।
শিল্প খাত প্রসঙ্গে তিনি জানান, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) নিয়ন্ত্রণাধীন ২৫টি মিলের মধ্যে ১৬টি মিল পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় পরিচালনার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়বে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং সরকারি ভর্তুকির চাপ কমবে বলে সরকার আশা করছে। একইসঙ্গে বিদ্যমান কর্মসংস্থানও সুরক্ষিত থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমেদ।
