সিলেটে হামে মৃত্যুর মিছিল

সিলেটে হামে মৃত্যুর মিছিল

ফন্ট সাইজ:

নবীগঞ্জের খরগাঁওয়ের ৭ মাস বয়সী নুসিবার হাম উপসর্গ দেখা দেয়ায় ভর্তি করা হয়েছিল সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ভর্তির পরপরই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। এরপর নেয়া হয়েছিলো পিআইসিইউতে। সেখানে ভর্তি থাকা অবস্থায় সোমবার মারা যায় নুসিবা। একইভাবে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল কানাইঘাটের আগতালুক গ্রামের ২ বছর বয়সী রাফসা। অবস্থা গুরুতর হওয়ার পর তাকে পিআইসিইউতে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে তার মৃত্যু হয়। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে সিলেটে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে এই দুই শিশু। এর আগে গত রোববার ৩ জন ও শুক্রবার আরও ৩ শিশুর মৃত্যু হয়। গত চারদিনে মৃত্যুর সংখ্যা ৮ জন। এই মৃত্যুর মিছিলে সিলেটে নানা শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কেন বাড়ছে মৃত্যু সংখ্যা- এমন প্রশ্নের জবাবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন- অনেক শিশুকেই গুরুতর অবস্থায় সিলেটের সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের এসডিইউ ও পিআইসি সাপোর্ট তাৎক্ষণিক দেয়া হলেও বাঁচানো যায় না। দেরিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াকে এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে। তারা বলেন- বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীর গুরুতর পর্যায়ে গেলেই সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। সরকারি হাসপাতালে সর্বশেষ পিআইসিইউ সেবা রয়েছে। ফলে পিআইসিইতে ভিড় বেশি। অনেক সময় রোগীর অবস্থা স্থিতিশীল না হলে পিআইসিইউ থেকে সরানো যায় না। এতে দেখা যায় গুরুতর রোগীদের অপেক্ষায় রাখতে হয়। এতে করে মৃত্যু বাড়ে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য মতে সিলেটের দু’টি হাসপাতালে সব মিলিয়ে ৩৪টি পিআইসিইউ রয়েছে। এর মধ্যে ওসমানী হাসপাতালে রয়েছে ২০টি ও শহীদ শামসুদ্দিনে ১৪টি। দুটি হাসপাতালে পিআইসিইউই রোগীতে ঠাসা। আর বেড বাড়ানোর সুযোগও কম। বেসরকারি হাসপাতালে সেই সুবিধা থাকলেও হাম ও উপসর্গের রোগীকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না। ফলে দু’টি সরকারি হাসপাতালের উপর নির্ভর করছে রোগীর সর্বশেষ চিকিৎসা সেবা।

ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা জানিয়েছেন-বর্তমানে যেসব রোগী মারা যাচ্ছে তাদের বয়স ৩ থেকে ৭ মাসের মধ্যে। এই শিশুরা টিকা গ্রহণের আওতায় ছিল না। এই বয়সী যেসব শিশুরা হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন তাদের পিতা মাতারও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম। একেবারে দিনমজুর ও খেটে খাওয়া পরিবারের বেলায় এমন ঘটনা ঘটছে। এছাড়া হাওর ও গ্রামাঞ্চলে বর্তমানে রোগীর সংখ্যা বেশি। তবে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন- হাম কিংবা উপসর্গ নিয়ে প্রথম পর্যায়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন তাদের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হচ্ছে। এজন্য অভিভাবকদের সচেতনতা প্রয়োজন বলে জানান- তারা। সিলেটে হামের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল শহীদ শামসুদ্দিনের আবাসিক চিকিৎসক ডা. মিজানুর রহমান গতকাল দুপুরে মানবজমিনকে জানিয়েছেন- দুই মাস আগে দেওয়া টিকার প্রভাব বেশ পড়েছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি হাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে মৃত্যু বাড়ছে। সেখানে চিকিৎসকদের চেয়ে অভিভাবকদের গাফিলাতি রয়েছে। একবাবে অন্তিম সময়ে হাসপাতালে শিশুদের নিয়ে আসা হয়। তিনি বলেন- বর্তমানে অনেক রোগী মিলছে যারা সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। গ্রামপর্যায়ে কোথাও কোথাও কমিউনিটি লেবেলে হাম সংক্রমণ থাকতে পারে।

এদিকে সিলেট অঞ্চলে গত ৪ মাসে হাম আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে মারা গেছেন ১০৫ জন রোগী। বলা হচ্ছে রাজধানী ঢাকার পর সবচেয়ে বেশি রোগীর মৃত্যু হচ্ছে সিলেটে। রোগী মৃত্যুর দিক থেকে সুনামগঞ্জে সবচেয়ে বেশি। ৪৭ জন রোগী মারা গেছেন এ জেলার। রোগী সংখ্যাও বেশি ওখানের। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে সিলেট। হাসপাতালে গতকাল বিকেল পর্যন্ত রোগী ভর্তি ছিলেন ২৭৩ জন। এর মধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১০৫জন ও ওসমানী হাসপাতালে ১০১ জন ভর্তি রয়েছেন। এদিকে হাম ও উপসর্গ নিয়ে তেমন দুশ্চিন্তা নেই স্বাস্থ্য বিভাগের কর্তকর্তাদের। সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. নাসির উদ্দিন মানবজমিনকে জানিয়েছেন- ধারণা করা হচ্ছে এটা সিলেটে হামের লাস্ট স্টেইজ। টিকাদান কর্মসূচি সফল হয়েছে। অনেক উন্নতি হয়েছে। আগামী দুই থেকে আড়াই সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি আরো স্বাভাবিক হবে। তবে যারা মারা যাচ্ছেন তারা সবাই হামে না। হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হলে অন্যান্য রোগেও তাদের মৃত্যু হচ্ছে বলে জানান তিনি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন