তদন্তে দোষী ৯ কর্মকর্তা

পাবিপ্রবিতে ‘অনৈতিক নিয়োগ’

তদন্তে দোষী ৯ কর্মকর্তা

ফন্ট সাইজ:

অবশেষে সত্যতা মিলেছে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ব-বিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) বহুল আলোচিত অনৈতিক নিয়োগ, আপগ্রেডেশন ও পদোন্নতি কাণ্ডের। মানবজমিনে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যে তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল, সেই কমিটির প্রতিবেদনে নিয়োগ ও আপগ্রেডেশনে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৯ জন কর্মকর্তাকে সরাসরি দায়ী করা হলেও রহস্যজনক কারণে এখনো তাদের বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বরং অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তে গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। জানা গেছে, মানবজমিনে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে ২০২৫ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বশীর আহমেদ। সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার অধ্যাপক ড. মো. মিনহাজ-উল-হক এবং সদস্য ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান মণ্ডল।

দীর্ঘ ১৭ মাসের বেশি সময় ধরে নথিপত্র যাচাই-বাছাই, সাক্ষ্যগ্রহণ ও অনুসন্ধান শেষে গত ২৫শে জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বরাবর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়। প্রতিবেদনে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট নিয়োগ ও আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালা এবং সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে বর্তমান রেজিস্ট্রার বিজন কুমার ব্রহ্ম, অতিরিক্ত পরিচালক মো. শাহান শাহ, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার তাওহিদা খানম, অতিরিক্ত পরিচালক মো. ফারুক হোসেন চৌধুরী, অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার মো. কামরুল হাসান, অতিরিক্ত গ্রন্থাগারিক মো. হাফিজুর রহমান মোল্লা, অতিরিক্ত পরিচালক জি এম শামসাদ ফখরুল, উপ-রেজিস্ট্রার আব্দুল মজিদ এবং উপ-রেজিস্ট্রার জহুরুল ইসলাম প্রিন্সকে দায়ী করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এসব নিয়োগের অনেক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, বয়সসীমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং বিধিবদ্ধ শর্ত পূরণ করা হয়নি। কোথাও অভিজ্ঞতার ঘাটতি, কোথাও বয়সসীমা অতিক্রম, কোথাও শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ ও পরবর্তী সময়ে পদোন্নতি দেয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ পাওয়ার পরও কেউ কেউ চাকরিরত অবস্থায় প্রয়োজনীয় ডিগ্রি অর্জন করেছেন। অথচ এসব বিষয় উপেক্ষা করে তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয় এবং পরবর্তীতে উচ্চতর পদেও উন্নীত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিগত সরকারের আমলে পাবিপ্রবি কার্যত একটি নিয়োগ বাণিজ্যের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় আনুগত্য, প্রভাবশালী ব্যক্তির সুপারিশ এবং আর্থিক লেনদেন ছাড়া নিয়োগ পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। নিয়োগ বোর্ড থেকে শুরু করে সিন্ডিকেট পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হতো বিশেষ একটি বলয়ের মাধ্যমে।

অভিযোগের তীর সবচেয়ে বেশি তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মোজাফফর হোসেনের দিকে। বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, তার দায়িত্বকালেই বিতর্কিত নিয়োগ ও আপগ্রেডেশনের বেশির ভাগ ঘটনা ঘটেছে। নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে ক্যাম্পাসে আলোচিত। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তারা জানান, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন জমা দেয়ার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে নীরব। তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়মের বিষয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও অভিযুক্তরা এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বহাল রয়েছেন।

এ বিষয়ে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মোহাম্মদ শামীম বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে, তাদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন