রাজধানীর উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনার বছরপূর্তিতে নিহতদের চোখের জ্বলে স্মরণ করেছে সহপাঠীরা। গতকাল মাইলস্টোনের সেই দুর্ঘটনাস্থল ভরে উঠেছিল ফুলে ফুলে। এক বছর আগে যে জায়গায় মুহূর্তেই থমকে গিয়েছিল অসংখ্য শিশুর জীবন। নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন আর স্কাউট-রোভার সদস্যদের গার্ড অব অনারে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। নিহতদের আত্মার শান্তি ও আহতদের জন্য বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়। দেয়ালে দেয়ালে প্রদর্শিত হচ্ছে নিহত শিশুদের ছবি, বন্ধুদের লেখা স্মৃতিকথা ও নানা বার্তা। এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেদিনের শোক যেন আজও তাজাÑ স্মৃতির পাতায় নয়, মাইলস্টোনের প্রতিটি কোণে, স্বজনদের চোখে আর বেঁচে ফেরা শিশুদের মনে। গতকাল মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে এসেছিলেন অনেক অভিভাবক। তারা বলেন, দুর্ঘটনার পর থেকে আহত ও প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থীদের আচরণে পরিবর্তন এসেছে। কেউ হঠাৎ রেগে যায়, কেউ সবকিছুতেই বিরক্তি প্রকাশ করে। আকাশে বিমানের শব্দ শুনলে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। কেউ কান চেপে ধরে। আবার কেউ রাতে ঘুমের মধ্যে কেঁদে ওঠে।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্ণ হলেও স্বজনদের মনে রয়েছে নানা প্রশ্ন। দুর্ঘটনার কারণ, তদন্তের ফলাফল, দায় ও জবাবদিহিতাÑ সবকিছু নিয়ে তাদের মধ্যে এখনো অসন্তোষ রয়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন জমা পড়লেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে পারেনি সেখানে কী বলা হয়েছে। মেলেনি প্রত্যাশিত ও প্রতিশ্রুত ক্ষতিপূরণ।
তারা জানতে চানÑ কেন দুর্ঘটনা ঘটলো? কেন জনবসতিপূর্ণ এলাকার উপর প্রশিক্ষণ বিমান চলাচল করছিল? ভবন নির্মাণে কোনো ত্রুটি ছিল কিনা? ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? নিহত তানভীরের বাবা রুবেল মিয়া মনে করেন, দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ কারণ এবং তদন্তের সুপারিশ জনসমক্ষে আসা প্রয়োজন। নিহত মাহতাবের বাবা মিনহাজ রহমানের দাবি, স্কুলটি সরানো হোক অথবা প্রশিক্ষণ বিমান চলাচলের এলাকা পরিবর্তন করা হোক। বলেন, আমাদের সন্তান তো চলে গেছে। কিন্তু আর কোনো পরিবারের সন্তান যেন এভাবে না যায়।
২০২৫ সালের ২১শে জুলাই। সেদিন দুপুরে বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান মাইলস্টোনের হায়দার আলী একাডেমিক ভবনে বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই বদলে যায় শত শত পরিবারের জীবন। আগুন, ধোঁয়া, আর্তনাদ আর ছোটাছুটিতে ভয়ার্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয় স্কুল প্রাঙ্গণে। প্রাণ হারান ৩৬ জন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জনই শিক্ষার্থী। আহত হন আরও বহু মানুষ। কিন্তু এর বাইরে অনেক শিশুর শৈশব বদলে দিয়েছে এই ট্র্যাজেডি।
মাইলস্টোন যাওয়ার সড়কটি সরু ও খানাখন্দে ভরা। দুর্ঘটনার পর সরজমিন সেখানে গিয়ে দেখা গিয়েছিলÑ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পর সরু ভাঙা সড়কের কারণে তাই উদ্ধার কাজে ব্যাঘাত ঘটেছে। ঠিকমতো যাতায়াত করতে পারছিল না উদ্ধারকারী যানবাহনগুলো। ক্যান্টিনের সামনে বন্ধুদের সঙ্গে অপেক্ষা করছিল শিক্ষার্থী সাদিক ইসলামসহ কয়েকজন। নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী সাদিক বলে, আমরা ক্যান্টিন ও বিল্ডিং-এর মাঝখানে ছিলাম। একটা বিমানের শব্দ পাই। মনে হলো, নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেখি বিমানটি নিচের দিকে নামছে। স্কুল মাঠে ল্যান্ড করার চেষ্টা করছে। এরপর বিমানটি দোতলা ব্লিডিং এর প্রবেশ পথ ও তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির ক্লাসরুমের দিকে আঘাত করে। প্রথমে কিছুটা অল্প আগুন ছিল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরই বিকট শব্দ হয়।
সাদিক বলে, আঘাত হানার পর মনে হয়েছে বিমানে থাকা কিছু ব্লাস্ট করে। এরপর আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আমরা কী করবো কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। দেখি বাচ্চারা দৌড়ে বেরিয়ে আসছে। অনেকের শরীরে রক্ত, পোড়া। কয়েকটা শিশুর শরীরে আগুন জ্বলছিল। এক বাচ্চার একটি হাত উড়ে গেছে। আমরা উদ্ধার করতে এগিয়ে গেলেও আগুনের কারণে ভেতরে যেতে পারিনি। এরপর শিক্ষকরা আমাদের চলে যেতে বলেন, যেন পুনরায় ব্লাস্ট হলে আমরা নিরাপদে থাকি।
দুর্ঘটনার দিন ছোট বোনকে খুঁজে পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছিল অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী নিলয় আল নাফিকে। তার ছোট বোন তখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়তো। অতিরিক্ত ক্লাসের জন্য সে দুর্ঘটনাকবলিত ভবনেই ছিল। নাফি জানায়, ঘটনার সময় সে ও তার মা স্কুলের বাইরে ছিলেন। হঠাৎ যুদ্ধবিমানের মতো বিকট শব্দ শুনতে পান তারা। কিছুক্ষণ পর বিস্ফোরণের শব্দ। ঘুরে তাকিয়ে দেখেন, স্কুলের একটি ভবনের অংশে আগুন জ্বলছে। উদ্ধারের সেই মুহূর্তের কথা এখনো ভুলতে পারেনি নাফি। ভবনের জানালা কেটে এবং বিভিন্নভাবে শিক্ষার্থীদের বের করে আনা হচ্ছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময়েও তার বোনের কোনো সন্ধান মিলছিল না। প্রায় এক ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা ১০ মিনিট পর স্কুলের গেটের কাছে বোনকে খুঁজে পান তারা। সেইদিনের পর দীর্ঘ সময় মানসিক আঘাতের মধ্যে ছিল নাফির বোন।
দুর্ঘটনার সময় যে ভবনে বিমানটি আছড়ে পড়েছিল, সেখানেই ছিল চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রুবাইদা নূর আলভীরা। ভয়াবহ দুর্ঘটনায় আহত হয়ে তাকে দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। বর্তমানে সে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। আলভীরা জানায়, দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় সে ট্রমার মধ্যে ছিল।
হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর সেইদিনের স্মৃতি তাকে আরও বেশি কষ্ট দিতো। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিল ২ মাস ৭ দিন। পরে স্কুল খুললে আবার ক্লাসে ফিরেছে। হারিয়ে যাওয়া বন্ধুদের কথা মনে পড়লে এখনো মন খারাপ হয়ে যায়। একটি শিশুর মুখে বন্ধুকে হারানোর এই স্মৃতি বলে দেয়Ñ দুর্ঘটনা শুধু সেদিনের ৩৬টি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, বদলে দিয়েছে বেঁচে থাকা অসংখ্য শিশুর শৈশবও।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির সবচেয়ে ভারী বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছেন নিহত শিক্ষার্থীদের স্বজনরা। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী তাসনিম আফরোজ আয়মানের মা আয়েশা আক্তার কাননের কাছে ২০২৫ সালের ২১শে জুলাইয়ের সকালটি এখনো স্পষ্ট। সেদিন মেয়েকে পোশাক পরিয়ে, খাওয়া-দাওয়া করিয়ে বাবার সঙ্গে স্কুলে পাঠিয়েছিলেন তিনি। আয়মান গাড়ি চালানো শিখেছিল। বাবার সঙ্গে অর্ধেক রাস্তা নিজেই গাড়ি চালিয়ে স্কুলে গিয়েছিল ১০ বছরের শিশুটি। সেদিনের দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চারদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যায় আয়মান।
মেয়ের শেষ সময়ের কথা বলতে গিয়ে এখনো কান্নায় ভেঙে পড়েন তার মা। আয়েশা বলেন, হাসপাতালে গিয়ে দেখেছিলেন তার ১০ বছরের মেয়েটির শরীরের বেশির ভাগ অংশ পুড়ে গেছে। তারপরও সে মাকে বলেছিল, আম্মু, আমার কিচ্ছু হয় নাই, তুমি কিন্তু কাঁদবা না। আর বাবা যেন না কাঁদে। মৃত্যুর মুখেও আয়মান নিজের কথা ভাবেনি।
চারদিন কষ্ট করার পর ২৫শে জুলাই ভোরে মারা যায় আয়মান।
সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন শিক্ষিকা মাহেরীন চৌধুরী। তিনি আগুনস্থল থেকে বের না হয়ে শিশুদের উদ্ধার করা শুরু করেন। এরপর হঠাৎ ছুটে আসা এক আগুনের ফুলকিতে দগ্ধ হন। এরপরও তিনি শিশুদের উদ্ধার করতে থাকেন। একপর্যায়ে আগুন পুরো শরীরে লেগে গেলে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই সাহসিকতার জন্য তিনি জনসেবা অবদানের জন্য (মরণোত্তর) স্বাধীনতা পুরস্কার পান।
শিক্ষার্থীদের মানসিক ক্ষত কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। রোটারি ক্লাব অব বনানী ঢাকা ও ছুটি রিসোর্টের যৌথ উদ্যোগে গাজীপুরের পুবাইলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজন করা হয় বিশেষ ‘মেন্টাল হিলিং’ কর্মসূচি। প্রকৃতির সান্নিধ্যে নিয়ে শিক্ষার্থীদের মেডিটেশন, ছবি আঁকা, ফুটবল খেলা ও উন্মুক্ত কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ দেয়া হয়। নিহত সহপাঠীদের স্মরণে এবং শোককে শক্তিতে রূপান্তরের প্রত্যয়ে সেখানে চারাগাছও রোপণ করা হয়। স্কুল থেকেও নেয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ।
