ঘটনা মনে হলে এখনো আঁতকে ওঠেন সাংবাদিকরা। এত নির্মমতা সিলেটের রাজপথে অতীতে কখনো ঘটেনি। সেদিন যা ঘটেছিলো এককথায় অবর্ণনীয়। বিশ্বাস ছিল পুলিশের প্রতি। অন্তত সাংবাদিকের উপর গুলি ছোড়া হবে না। এই বিশ্বাস অতীত থেকেই বিরাজমান। রাজপথে যাই হোক পুলিশ, সাংবাদিক একসঙ্গেই থাকেন। সেই বিশ্বাস ভাঙলেন এডিসি সাদেক কাওছার দস্তগীর। তোয়াক্কাই করলেন না। পাশে থাকা এক কনস্টেবলের হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে অবিরাম গুলি বর্ষণ শুরু করেন। একটু দূরেই ছিলেন সাংবাদিকরা। সিলেটের ফটোসাংবাদিক এটিএম তুরাব আরও কাছে। ছবি তুলতে মিছিলের অগ্রভাগে। পেছনে সড়কের রেলিং। পিছু হটার সুযোগ ছিল না।
এমন সময় পুলিশের গুলি। আর গুলিতে প্রাণ হারালেন এটিএম তুরাব। ঘটনাটি দুই বছর আগের। ১৯শে জুলাই। সিলেটের কোর্ট পয়েন্ট এলাকায়। প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকদের ওই দৃশ্য চোখের সামনে ভাসলেই আঁতকে ওঠেন। কিন্তু হত্যার বিচার হয়নি এখনো। মামলার তদন্তই শেষ হয়নি। তুরাবের সহকর্মী সাংবাদিকরা জানিয়েছেন- গণ-অভ্যুত্থানের পূর্ববর্তী সময়ে সিলেটে বেপরোয়া ছিলেন এডিসি দস্তগীর। তিনি ছিলেন সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উত্তর জোনের এডিসি। দীর্ঘদিন ধরে চাকরি করেন সিলেটে। এ কারণে তার জানা শোনা ছিল অনেক কিছুই। আর সেই সময় দস্তগীরের একের পর কর্মকাণ্ডে বিতর্ক দেখা দিলেও সরকার কিংবা পুলিশ প্রশাসন তার ব্যাপারে নীরব ছিলেন। ফলশ্রুতিতে অভ্যুত্থান পূর্ববর্তী সময়ে দস্তগীর হয়ে উঠেছিলেন বেপরোয়া। দেখলেই গুলি ছুড়তেন।
শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের এলাকা, কোর্ট পয়েন্ট, চৌহাট্টা সহ কয়েকটি এলাকায় নিজেই বন্দুক হাতে গুলি ছুড়েন। আর ওই সময় বন্দুক ছোড়ার দৃশ্যটি ভাইরাল হলেও কোনো কিছু তাকে দমাতে পারেনি। বেপরোয়াভাবেই বিরোধী দল দমনে অ্যাকশন চালান। ওইদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন- একাত্তরের কথার চিফ ফটোসাংবাদিক মুহিদ হোসেন। তুরাব গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তাকে উদ্ধার করে হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে যান তিনি। তুরাব হত্যা মামলাটি এখন তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিয়োজিত পুলিশের একটি টিম। এ মামলায় মুহিদ হোসেন আদালতে সাক্ষী হিসেবে বক্তব্য। সঙ্গে ফটো জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সিলেটের বর্তমান সভাপতি হুমায়ূন কবীর লিটনও। সাংবাদিক মুহিদ জানিয়েছেন- পাশে থাকা কনস্টেবলের হাত থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে গুলি ছুড়েন এডিসি দস্তগীর। এরপর তার পাশে থাকা উজ্জ্বল সিংহ নামে আরেক পুলিশ কনস্টেবল গুলি ছুড়েন।
ওইদিন ঘটনাস্থলে ছিলেন মানবজমিন-এর ফটো সাংবাদিক মাহমুদ হোসেন। তার এলাকা বিয়ানীবাজারেই বাড়ি তুরাবের। ভালো সম্পর্ক ছিল দু’জনের। মাহমুদ জানান- তুরাবকে এমন ভাবে গুলি করা হয়েছে তার চোখে, মুখে সবখানেই বুলেটবিদ্ধ হয়। এতে তার অনেক রক্তক্ষরণ হয়। আমাদের কাছাকাছি ছিল। বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ শুরু হলে আমরা দৌড়ে সেফ জোনে যেতে পারলেও সড়কের ব্যারিকেডের কারণে সে নড়তে পারেনি। ওইদিনের সব অ্যাটাক যেন তুরাবের উপর দিয়েই গেছে বলে জানান- তিনি। ১৯শে জুলাই, শুক্রবার। বাদ জুমা বিএনপি সহ বিরোধী জোটের নেতাকর্মীরা কোর্ট পয়েন্ট থেকে মিছিল বের করেন। ওই সময় সেখানে দায়িত্বে ছিলেন এডিসি দস্তগীর। জুমার নামাজের পর মিছিল শুরু হতেই কয়েকশ’ রাউন্ড গুলি, টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে পুলিশ।
ওই ঘটনায় পুলিশের গুলিতে শরীর ঝাঁঝরা হয়ে যায় দৈনিক জালালাবাদ ও নয়া দিগন্তের ফটো সাংবাদিক এটিএম তুরাবের। গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে এ ঘটনার সঠিক এজাহার দাখিল করা হলে তদন্ত শুরু হয়। এরই মধ্যে এডিসি দস্তগীর ও কনস্টেবল উজ্জ্বল গ্রেপ্তার হয়েছে। তারা সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে।
মামলার তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই। তবে ট্রাইব্যুনালের এক আদেশে মামলাটি উচ্চপর্যায়ে তদন্ত করছে পুলিশের আরেকটি বিশেষ টিম। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও তদন্ত শেষ হয়নি। গত সপ্তাহে সিলেট ঘুরে গেছেন বিশেষ তদন্ত টিমের সদস্যরা। বক্তব্য গ্রহণ করেছেন তুরাবের অনেক সহকর্মীর। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ইন্সপেক্টর মো. মুরসালিন মানবজমিনকে জানিয়েছেন- তুরাব হত্যা মামলার তদন্ত আন্তর্জাতিক আদালতের নির্দেশে একটি বিশেষ টিম করছে। ওই টিমে রয়েছেন ইন্সপেক্টর জসিম। পিবিআইও করছে। তবে বিশেষ টিমের তদন্ত নিষ্পত্তির পর পিবিআই তদন্ত নিষ্পত্তি করবে।
