ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেছে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। মঙ্গলবার (২১ জুলাই) কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, মল্লিকার্জুন খাড়গে ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বে দলের নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে মিছিল করেছেন। খবর এনডিটিভির।
দেশটির ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বা ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভের একদিন পরেই কংগ্রেস এমন কর্মসূচি পালন করছে।
দলীয় সূত্রের বরাতে এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী রাতভর বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে পারেন। এরইমধ্যে রাহুল গান্ধী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে সমর্থকদের বিক্ষোভে যোগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি লিখেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা মানে প্রতিটি ভারতীয় পরিবারের ওপর হামলা। প্রধানমন্ত্রী মোদি মনে করেন, কোনো জবাবদিহি বা পরিণতি ছাড়াই তিনি পার পেয়ে যাবেন। এবার তা হবে না। আমি প্রত্যেক দেশপ্রেমিক ভারতীয়কে আহ্বান জানাচ্ছি, যারা মনে করেন শিক্ষার্থীরা ন্যায়বিচার পাওয়ার যোগ্য, তারা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে আমাদের অবস্থান কর্মসূচিতে যোগ দিন।
তিনি বলেন, ভারতের শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করা যাবে না।
মোদির বাসভবনের দিকে মিছিল
মঙ্গলবার দুপুরে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের বাসভবনের সামনে জড়ো হন দলীয় নেতা-কর্মীরা। সেখান থেকে তারা অল্প দূরত্বে অবস্থিত মোদির সরকারি বাসভবনের দিকে মিছিল করেন।
এনডিটিভি জানিয়েছে, বিক্ষোভ শুরুর কিছুক্ষণ পরই কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং ঘটনাস্থলে এসে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তবে কংগ্রেস নেতারা জানান, ওই আলোচনা কোনো সমাধানে পৌঁছায়নি।
কংগ্রেস সাংসদ সৈয়দ নাসির হুসেইন বলেন, সরকার আমাদের বিক্ষোভ প্রত্যাহার করতে বলেছিল। কিন্তু আমাদের দাবিগুলো না মানায় আমরা রাজি হইনি। আমরা শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে সংসদে পূর্ণাঙ্গ আলোচনার দাবি জানাচ্ছি। আরও সাংসদ, কংগ্রেস কর্মী ও সাধারণ মানুষ আমাদের আন্দোলনে যোগ দেবেন।
মোদি ও অমিত শাহর পদত্যাগ দাবি
গতকাল সোমবার ‘তেলাপোকা’ আন্দোলনের বিক্ষোভে শিক্ষার্থী ও তরুণদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনায় সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন রাহুল গান্ধী।
তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, গতকাল তরুণ শিক্ষার্থীদের ওপর যে নৃশংসতা চালানো হয়েছে, তার জবাব চাইতে আমরা প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে এসেছি। সরকার কোনো জবাবদিহি করতে চায় না, সংসদেও এ নিয়ে আলোচনা করতে চায় না। ভারতের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার দায়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পদত্যাগ করা উচিত।”
এদিন বিক্ষোভের খবর পেয়ে দিল্লি পুলিশ দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের নিরাপত্তা জোরদার করে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে। পরে কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটকও করা হয়।
এদিকে বিজেপি অভিযোগ করেছে, কংগ্রেসের এই কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
তবে কংগ্রেস নেতা ও সাংসদ মানিকম ঠাকুর বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংসদে থাকেননি। গতকালও তিনি খুব অল্প সময়ের জন্য সংসদে ছিলেন। তাহলে আমরা আমাদের কথা কোথায় বলব? আমাদের বিক্ষোভ সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।
বিরোধী জোটে মতভেদ
কংগ্রেসের এই কর্মসূচি নিয়ে বিরোধী শিবিরেও মতভেদের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। আম আদমি পার্টি (এএপি) দাবি করেছে, কংগ্রেসের এই বিক্ষোভ আসলে বিজেপিরই কৌশল। তাদের অভিযোগ, ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন থেকে জনদৃষ্টি সরাতেই এ কর্মসূচিকে উৎসাহ দেয়া হয়েছে।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ইস্যুতে সংসদে অচলাবস্থা
সোমবার শুরু হওয়া বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দুই দিনই নির্ধারিত সময়ের আগেই সংসদের কার্যক্রম মুলতবি হয়ে যায়। কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, তারা প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলার বিষয়টি সংসদে তুলতে চাইলেও তাদের কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়নি।
রাজ্যসভার বিরোধীদলীয় নেতা মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার বিষয়টি তুলতে চেয়েছিলাম। তাদের লাঠিচার্জ করা হয়েছে, টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়েছে, মারধর করা হয়েছে, অনেকে হাসপাতালে ভর্তি। আমরা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংসদে কথা বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কথা বলতে দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই মাইক্রোফোন বন্ধ করে দেয়া হয়। এটাই কি গণতন্ত্র?
আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের বৈঠক
সোমবার সিজেপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে.পি. নাড্ডা। মঙ্গলবার তিনি দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া (আরএমএল) হাসপাতাল ও লেডি হার্ডিঞ্জ হাসপাতালে গিয়ে আহত বিক্ষোভকারীদেরও খোঁজ নেন।
সরকার জানিয়েছে, তারা আন্দোলনকারীদের দাবি শুনতে ও আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। তবে কোনো ধরনের সহিংসতা বরদাশত করা হবে না।
এদিকে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় মুখ খুলেছেন। এনডিএ সংসদীয় দলের বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো জাতীয় দায়িত্ব এবং এ ধরনের ঘটনা রোধে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও জানান, প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
