গর্ভাবস্থায় একটু ওজন বৃদ্ধি হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু অতিরিক্ত স্থূলতা মা ও শিশুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। গর্ভাবস্থায় শরীরে হরমোন, রক্তচাপ, ওজন সব পরিবর্তন হয়। তাই পূর্ব থেকেই স্থুলতা থাকলে এই পরিবর্তনগুলো ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। গর্ভবস্থার শুরুতে বিশেষ করে প্রথম ১২ সপ্তাহের মধ্যে BMI (Body Mass Index) নির্ধারণ করে স্থুলতা নির্ণয় করা যায়। কোনো মায়ের BMI ৩০ বা বেশি হলে তাকে obese বা স্থুল ধরা হয়। সূত্র হচ্ছে ⇒ BMI = ওজন(কেজি) /উচ্চতা (মিটার)
গর্ভকালীন মাতৃ ঝুঁকি-
গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ-রক্তচাপ, প্রি- এক্লাম্পসিয়া, এক্লাম্পসিয়া, রক্ত জমাট বাঁধা (Venous Thrombo embolism), ঘুমের সময় শ্বাসকষ্ট (obstructive sleep-Apnea) ইত্যাদির ঝুঁকি থাকে। এছাড়া মূত্রনালীর সংক্রমণ ও অন্যান্য সংক্রমন বৃদ্ধির ঝুঁকি দেখা যায়। গর্ভাবস্থায় পর্যবেক্ষণ ও আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে কিছু অসুবিধা হয়ে থাকে।
যেমনঃ
* ছবির মান খারাপ হওয়া, জন্মগত ত্রুটি শনাক্ত করতে অসুবিধা, গর্ভফুলের সঠিক অবস্থান নির্ধারনে সমস্যা, স্ক্যান করতে সময় ও বেশি লাগে, বার বার USG করারও প্রয়োজন হয়ে থাকে।
গর্ভাস্থায় ভ্রুণের ঝুঁকি
জন্মগত ত্রুটি, গর্ভপাত Still birth, অতিরিক্ত বৃদ্ধি (Macrosomia)। জন্মকালীন আঘাত, অতিরিক্ত ওজনের কারনে জটিলতা, সর্বোপরি নবজাতকের নিবির পরিচর্যার প্রয়োজনীয়তা (Niců) বেড়ে যায়।
প্রসবকালীন জটিলতাঃ
দীর্ঘায়িত প্রসব, প্রসব শুরু হতে বিলম্ব হওয়া, Induction of laboure / প্রসব প্ররোচনা, প্রসবের অগ্রগতি (Progress) ব্যাহত হওয়া, সিজারিয়ান অপারেশনের হার বৃদ্ধি, যৌনিপথে প্রসবে বিশেষ যন্ত্রের ব্যবহারের (Forceps, Vaccum/vanlose) প্রয়োজন বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চার কাঁধ আটকে যাওয়ার (Shoulder dystocia) মতো ঘটনাও ঘটে থাক। প্রসবের রাস্তায় ও অন্যান্য অংশে আঘাত ও লাগতে পারে।
অ্যানেস্থেশিয়া সংক্রান্ত জটিলতাঃ
স্থুল গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে অ্যানেস্থেশিয়া (বিশেষত সিজারিয়ান সেকশনের সময়) দেয়া তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়। Difficult Ventiletion, দ্রুত অক্সিজেন ঘাটতি, স্পাইনাল বা এপিডুরাল দেয়া কঠিন হয়। Failed বা অসম্পূর্ণ অ্যানেস্থেশিয়া, অ্যাসপিরেশনের ঝুঁকি, অপারেশনের সময় শ্বাস ও পরে শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
করনীয়:
১. গর্ভাবস্থার শুরুতেই BMI নির্ণয় করা, উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও অন্যন্য রোগের সনাক্তকরণ ও পূর্ন চিকিৎসা দেয়া, পুষ্টিগত অবস্থা ও জীবনযাত্রার অভ্যাস পর্যালোচনা করে ব্যবস্থা নেয়া।
২. স্থূল মায়েদের জন্য সাধারনত ৫-৯ কেজি পর্যন্ত ওজন বৃদ্ধি স্বাভাবিক। ইচ্ছাকৃত ওজন কমানোর চেষ্টা সাধারণত সুপারিশ করা হয় না।
৩. ডায়েটিশিয়ান বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ মত চলা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত প্রোটিন গ্রহন, নিয়মিত খাবার খাওয়া এবং অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এড়ানো।
৪. সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম, হাঁটা, সাঁতার বা গর্ভাবস্থার উপযোগী ব্যায়াম করা যেতে পারে। প্রয়োজনে physiotherapist এর সাহায্য নেয়া যেতে পারে।
৫. নিয়মিত ANc এর পাশাপাশি, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখা, প্রয়োজনে অতিরিক্ত আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ।
৬. প্রসবের পরিকল্পনা আগে থেকেই করা উচিত। সিজারিয়ান অপারশনের সম্ভাবনাই বেশি থাকে। তাই অজ্ঞানের ডাক্তার দ্বারা পূ্র্বেই চেক-আপ করিয়ে নেয়া আব্যশক।
৭. প্রসব পরবর্তীতে স্বাস্থ্যকর খাদ্যভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চেষ্টা করা, স্তন্যদানে উৎসাহিত হতে হবে।
মূলতঃ ভবিষ্যৎ গর্ভধারণের পূর্বে স্বাস্থ্যকর BMI অর্জনের চেষ্টা করাটাই হবে কার্যকরী পদক্ষেপ।
লেখক
ডাঃ সারাবান তহুরা
কনসালটেন্ট, গাইনি এন্ড অবস
চেম্বার: আলোক মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার, মিরপুর-৬
হটলাইন: ১০৬৭২, ০৯৬১০১০০৯৯
