দুই প্রান্তের দুই চিত্র

দুই প্রান্তের দুই চিত্র

ফন্ট সাইজ:

আটলান্টিক মহাসাগর দ্বারা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় আর্জেন্টিনা ও স্পেনের মধ্যে কোনো স্থলপথ বা সড়ক যোগাযোগ নেই। ফলে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম আকাশ ও সমুদ্রপথ। আকাশপথে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্স থেকে স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদের দূরত্ব প্রায় ১০,০০০ থেকে ১০,৫০০ কিলোমিটার। সরাসরি ফ্লাইটে এ পথ অতিক্রম করতে সাধারণত সময় লাগে ১২ থেকে ১৩ ঘণ্টা।

রোববার (১৯শে জুলাই) পর্যন্ত দেশ দুইটির চিত্র একই ছিল বললে ভুল হবে না। কেননা, উভয় দেশই ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর ফাইনালে উঠে। এতে দেশ দুইটির লাখ লাখ ফুটবলপ্রেমীরা উল্লাসে মাতোয়ারা ছিলেন। অপেক্ষায় ছিলেন শিরোপা জয়ের আনন্দে মেতে উঠতে। তবে রোববারের ফাইনাল ম্যাচের পরেই দেশ দুইটির চিত্র পুরোপুরি বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্পেনের কাছে ১-০ গোলে পরাজয়ের পর বিক্ষোভ-সংঘর্ষে উত্তাল হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনা। অন্যদিকে স্পেনের চিত্র পুরোটাই বিপরীত। ফাইনালে ওঠার আনন্দের সঙ্গে যোগ হয়েছে শিরোপা জয়ের উল্লাস। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আনন্দে ভাসছে স্পেন। রোববার (১৯শে জুলাই) রাতভর রাজধানী মাদ্রিদসহ দেশটির বিভিন্ন শহরের রাস্তায় নেমে আসে হাজার হাজার সমর্থক। আতশবাজি, লাল রঙের ফ্লেয়ার ও স্পেনের লাল-হলুদ পতাকায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো শহর।

নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের একমাত্র গোলে জয় নিশ্চিত করে স্পেন। এরপরেই ঐতিহাসিক এই জয়ের পর মাদ্রিদের প্রধান সড়কগুলো পরিণত হয় উৎসবের জনসমুদ্রে। এদিন দেশ-বিদেশ থেকে আসা সমর্থকেরা আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন।

বার্সেলোনা থেকে আসা সমর্থক মারিও বলেন, আমি বার্সেলোনা থেকে গাড়ি চালিয়ে মাদ্রিদে এসেছি, যাতে এখানকার সমর্থকদের সঙ্গে বসে ম্যাচটি দেখতে পারি। তিউনিসিয়া থেকে শহরটিতে উড়ে আসা সমর্থক ইসলাম বলেন, আমি জানতাম এখানে আসাটা সার্থক হবে। আমি বিশ্বাস করতাম স্পেনই জিতবে। ভিভা এস্পানিয়া!

মালাগা থেকে মাদ্রিদে বড় পর্দায় খেলা দেখতে আসা আলভারো আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, আমি ভীষণ খুশি। এটি অসাধারণ এক অনুভূতি। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো রুদ্ধশ্বাস ফাইনাল শেষে শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই স্পেনের শহর ও জনপদ জুড়ে শুরু হয় বিজয় উৎসব। বিশেষ করে বার্সেলোনায় সমর্থকেরা আতশবাজি ফুটিয়ে এবং সমুদ্রসৈকতে নেচে-গেয়ে বিজয় উদ্‌যাপন করেছেন।

এ ছাড়া স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালের বেড়ে ওঠার এলাকা রোকাফোন্ডার রাস্তাতেও ছিল উৎসবের আমেজ।
পতাকা হাতে সমর্থকেরা আনন্দ মিছিল করেন এবং নিজেদের এলাকার ছেলের বিশ্বজয়ের সাফল্য উদ্‌যাপন করেছেন।
১৯ বছর বয়সী ইয়ামাল বার্সেলোনা থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার উত্তরে মাতারো শহরের শ্রমজীবী ও বহু-জাতিগোষ্ঠীর আবাস রোকাফোন্ডার রাস্তায় ফুটবল খেলেই বড় হয়েছেন। সেখানকার বাসিন্দারা তাকে নিজেদেরই একজন বলে মনে করেন। তাদের উৎসব যেন থামছেই না।

এদিকে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, আমরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন! আমাদের জাতীয় দল অসাধারণ খেলেছে। ধন্যবাদ, দল! অন্যদিকে ফাইনালে পরাজয়ের পরেই আর্জেন্টিনার উৎসবের আমেজ মুহূর্তেই সংঘর্ষে পরিণত হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় দফায় দফায় বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
বুয়েন্স আয়ার্স সহ একাধিক স্থানে বিক্ষুব্ধ সমর্থকদের ছত্রভঙ্গ করতে দেশটির পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ম্যাচ শেষ হওয়ার পর হাজারো সমর্থক বুয়েন্স আয়ার্সের কেন্দ্রস্থলের জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ ওবেলিস্ক এলাকায় জড়ো হন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। অভিযোগ, বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা পুলিশের দিকে কাঁচের বোতল ও বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন। এর জবাবে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংঘর্ষে কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছে। ইতিমধ্যে দেশটিতে পুলিশ ও ফুটপ্রেমীদের মধ্যে সংঘর্ষের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, এক দাঙ্গা পুলিশ একজন সমর্থকের মাথায় লাথি মারছেন। এ সময় পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল ছুড়ছে সমর্থকরা।

প্রায় ১৫ মিনিট ধরে দেশটির রাজধানীতে তুমুল সংঘর্ষ চলে বলে একাধিক মিডিয়া নিশ্চিত করেছে। এর আগে স্পেনের কাছে পরাজয়ের পর কয়েকজন আর্জেন্টাইন ফুটবলার প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের ঘুষি, লাথি ও ধাক্কা দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া ট্রফি প্রদান অনুষ্ঠানের সময় নিউ জার্সিতে স্পেনের খেলোয়াড়দের দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়ানো নিয়েও আর্জেন্টিনা দলের ক্রীড়াসুলভ আচরণ নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন