ভারতের যুব-নেতৃত্বাধীন ‘ককরোচ’ আন্দোলনের সমর্থকদের ওপর সোমবার লাঠিচার্জ করেছে পুলিশ। রাজধানী নয়াদিল্লিতে সংসদ অভিমুখে মিছিল করার চেষ্টা করলে এই ঘটনা ঘটে। এর আগে কর্তৃপক্ষ ওই কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি। কয়েক মাস আগে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এবং সংসদমুখী মিছিলকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় জনসমর্থিত চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখো তরুণের সমর্থন পাওয়ার পর আন্দোলনটি ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত হয়েছে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
শনিবার অনশনরত আন্দোলনকারী সোনম ওয়াংচুককে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পুলিশি পদক্ষেপ আন্দোলনকে আরও বেগবান করেছে। এর পর থেকেই হাজারো সমর্থক রাতভর রাজধানীর যন্তর মন্তর এলাকায় জড়ো হন। সেখানে সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন মিছিলের পরিকল্পনা ছিল। দিল্লি পুলিশের উপকমিশনার শচীন শর্মা জানান, ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-এর নেতাদের সঙ্গে পুলিশের বৈঠক হলেও কোনো সমঝোতা হয়নি। তিনি বলেন, প্রতিবাদস্থলে আর জায়গা নেই। এ অবস্থায় কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার সকালেই সেখানে প্রায় ১০ হাজার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সম্ভাব্য মিছিল ঠেকাতে ঘটনাস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।
লাঠিচার্জের অভিযোগ, পুলিশের অস্বীকার
টেলিভিশনের সম্প্রচারিত ভিডিওতে দেখা যায়, ব্যারিকেডঘেরা এলাকায় কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে পুলিশ লাঠি দিয়ে আঘাত করছে। তবে দিল্লি পুলিশ বলেছে, কোনো ধরনের বলপ্রয়োগ করা হয়নি এবং পুরো পরিস্থিতি পেশাদারভাবে সামাল দেয়া হচ্ছে। বৃষ্টিভেজা সকালে শান্তিপূর্ণভাবে জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীরা স্লোগান দেন- পদত্যাগ করো, পদত্যাগ করো। ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করো। নরেন্দ্র মোদি পদত্যাগ করো।
আলোচনার ইঙ্গিত আন্দোলনকারীদের
সিজেপির প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চলছে। তারা দেরিতে এলেও আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছি। উল্লেখ্য, গত মে মাসে জাতীয় মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা থেকে এই আন্দোলনের সূচনা। এতে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং তাদের পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয়। মিরাট থেকে আসা ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী আদি নাথান বলেন, ক্ষমতায় থাকা নেতারা অযোগ্য। আমি প্রতিবাদ করতে এসেছি। কারণ আমরা আর প্রশ্নপত্র ফাঁস দেখতে চাই না। এর অবসান হওয়া উচিত। উত্তর প্রদেশের আমরোহা থেকে আসা ২২ বছর বয়সী মোহাম্মদ তাবরেজ বলেন, আমরা এই দুর্নীতির অবসান চাই। প্রশ্নপত্র ফাঁস ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জালিয়াতি বন্ধ হোক- এই দাবিতেই এখানে এসেছি।
অনশন ভাঙার শর্ত দিলেন ওয়াংচুক
প্রথমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কেন্দ্রিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও পরে এটি কিছু বিরোধী রাজনৈতিক দলেরও সমর্থন পায়। ইনস্টাগ্রামে কয়েক দিনের মধ্যেই সিজেপির অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখে পৌঁছায় বলে দাবি করা হয়। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে গত মাসে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন। এরপর ২৮ জুন সোনম ওয়াংচুক অনির্দিষ্টকালের অনশনে যোগ দেন। সোমবার হাসপাতাল থেকে নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত হাতে লেখা বার্তায় ওয়াংচুক জানান, তিনি অনশন ভাঙবেন যদি সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার সাম্প্রতিক ব্যর্থতা ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় স্বীকার করে। অথবা আন্দোলনকারীদের সংসদে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয় এবং সংসদ সদস্যরা বিষয়টি উত্থাপনের আশ্বাস দেয়। কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা হাসপাতালে এসে একই প্রতিশ্রুতি দেন। কারণ তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে তিনি নিজে মিছিলে অংশ নিতে পারছেন না।
তরুণদের ক্ষোভের প্রতিফলন
বিশ্লেষকদের মতে, ককরোচ আন্দোলনের উত্থান ভারতের তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ও নিয়োগব্যবস্থায় দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৫ বছর ও তার বেশি বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৩.১ শতাংশ। তবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই হার ৯.৯ শতাংশ। শহরাঞ্চলে তা ১৩.৬ শতাংশ, আর গ্রামাঞ্চলে ৮.৩ শতাংশ।
