ফুড ডেলিভারি ম্যান জিতলেন চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার

ফুড ডেলিভারি ম্যান জিতলেন চীনের সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার

ফন্ট সাইজ:

চীনের অন্যতম সম্মানজনক সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেছেন ফুড ডেলিভারি ম্যান ওয়াং জিবিন। দৈনন্দিন জীবনে ডেলিভারি ম্যানদের মুখোমুখি হওয়া নানান চ্যালেঞ্জ ও সংগ্রামের প্রেক্ষাপটে রচিত তার কাব্যগ্রন্থ ‘লো ফ্লাইট’ মর্যাদাপূর্ণ ‘লু শুওন সাহিত্য পুরস্কার’ জিতে নিয়েছে। চীন সাহিত্যের জনক হিসেবে পরিচিত লু শুওনের নামে এই পুরস্কার দেয়া হয়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। ৫৬ বছর বয়সী ওয়াং জিবিন প্রায় ২০১৯ সালের দিকে ফুড ডেলিভারির কাজ শুরু করেন। কাজের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের লেখা কবিতা ও প্রবন্ধ পোস্ট করে তিনি দ্রুত পরিচিতি লাভ করেন। চীনের বিশাল গিগ ইকোনমি বা চুক্তিভিত্তিক কাজের বাজারের ওপর তৈরি হওয়া মানসিক ও সামাজিক চাপ নিয়ে সাহিত্য চর্চা করে প্রশংসা কুড়ানো ব্লু-লার বা শ্রমজীবী মানুষদের অন্যতম প্রতিনিধি এখন তিনি।

বহু বছর ধরে নানা ধরনের সাধারণ ও দিনমজুরের কাজ করার পর তার ঝুলিতে এলো এই ঐতিহাসিক স্বীকৃতি। পুরস্কার পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে ওয়াং জিবিন জানান, চরম মানসিক উত্তেজনায় তিনি যেন শ্বাস আটকে রেখেছিলেন। নাম ঘোষণার পরই কেবল তিনি স্বস্তি পান। তিনি আরও জানান যে এই পুরস্কারকে কেন্দ্র করে চারপাশের গণমাধ্যমের মাত্রাতিরিক্ত মনোযোগ তার ওপর বেশ মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। চীনের জিয়াংসু প্রদেশে জন্মগ্রহণকারী ওয়াং জিবিন পারিবারিক আর্থিক অনটনের কারণে কৈশোরেই লেখাপড়া ছাড়তে বাধ্য হন। ফুড ডেলিভারির কাজে আসার আগে তিনি নির্মাণ শ্রমিক, বর্জ্য সংগ্রাহক ও রাস্তার হকার হিসেবেও কাজ করেছেন। কিন্তু অর্থাভাবের মাঝেও পড়ার প্রতি তার ভালোবাসা কখনো কমেনি। বিগত এক দশক ধরে তিনি নিয়মিত সামাজিক মাধ্যমে নিজের কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশ করে আসছেন।

২০১৯ সালে ভুল ঠিকানা দেওয়া এক গ্রাহকের খাবার পৌঁছে দিতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে ২০২২ সালে তিনি ‘ম্যান ইন আ হারি’ শিরোনামে একটি কবিতা লেখেন, যা ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে ‘ম্যান ইন আ হারি: পোয়েমস অব আ ফুড ডেলিভারি রাইডার’ নামে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। পুরস্কারজয়ী কাব্যগ্রন্থ ‘লো ফ্লাইট’ ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়, যা তিনি প্রায় ২০০ জন ডেলিভারি ম্যানের সাক্ষাৎকার ও জীবনযাত্রার ওপর ভিত্তি করে রচনা করেছেন। মর্যাদাপূর্ণ এই সাহিত্য পুরস্কার পাওয়ার পরও কাজ ছেড়ে দেয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন ওয়াং জিবিন। তিনি জানান, ৬০ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত তিনি এই ডেলিভারির কাজ চালিয়ে যেতে চান।

আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকলেও এই কাজের পরিবেশ তাকে শারীরিকভাবে সুস্থ রাখে এবং তিনি স্বাভাবিক ও মাটির কাছাকাছি জীবনযাপন বজায় রাখতে চান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনে ওয়াং জিবিনের মতো সাধারণ শ্রমজীবী মানুষদের সাহিত্য জগতে উঠে আসার এক নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এর আগে কুরিয়ার কর্মী হু অ্যানিয়ানের স্মৃতিকথা এবং ভাসমান শ্রমিক ফ্যান ইউসুর আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধ চীনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। চীনের বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক লু শুওন, যার নামে এই পুরস্কারের নামকরণ করা হয়েছে, তিনি মূলত সামাজিক ব্যঙ্গাত্মক রচনার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। বর্তমান তরুণ সমাজেও তার লেখা সাহিত্য ও চরিত্রগুলো নতুন করে বিপুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন