ম্যাচ হেরে গেছি, কিন্তু মাঠ থেকে বের হতে পারছি না। দুই ঘণ্টা আটকে আছি। কারণ বের হলে দর্শকরা আক্রমণ করতে পারে। আর গালিটা তো শুনতে হবেই। কিন্তু এই সব মেনে নিতাম কারণ জানি এই দর্শকরাই মাঠের প্রাণ। আবার যখন জিতবো তখন তারাই মাথায় তুলে নাচবে। তাদের পুরো আবেগটি খেলা নিয়ে। ব্যক্তিগত কিছু ছিল না- দর্শকদের পুরনো গল্পের স্মৃতিচারণ এভাবেই করছিলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। রাজশাহীর শহীদ এএইচএম কামরুজ্জামান বিভাগীয় স্টেডিয়ামে ক্রিকেটার মোহাম্মদ মিঠুনকে লক্ষ্য করে গ্যালারি থেকে ‘দালাল দালাল’ স্লোগান দেয়া হয়েছে।
এক পর্যায়ে মেজাজ ধরে রাখতে পারেননি মিঠুন। ব্যাটিং ছেড়ে বাউন্ডারি লাইনের ধারে গিয়ে দর্শকদের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। মিঠুনের অপরাধ কি শুধু তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেটার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি? নাকি এটি পরিকল্পিত বিদ্বেষ? মাঠের পারফরম্যান্স ছাপিয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ এখন ক্রিকেটের বড় ক্ষত। হাবিবুল বাশার সুমনের মতে, এটি বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রথম কথা হলো এটা ভেরি আনফরচুনেট। ক্রিকেটাররা পলিটিক্স করে না। খেলা নিয়ে আপনি কথা বলতেই পারেন। পারফরম্যান্স খারাপ হলে ফ্রাস্ট্রেশন শো করতে পারেন। কিন্তু পার্সোনাল বিষয়ে মাঠে আক্রমণ আমাদের কালচারে ছিল না।’ রাজনীতি মাঠে টেনে আনা ক্রিকেটের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করছে। অতীতেও দর্শকদের মধ্যে উগ্রতা ছিল। তবে তার একটি নির্দিষ্ট সীমা ছিল।
হাবিবুল বাশার নিজের ক্যারিয়ার থেকে জানান যে, দর্শকদের ক্ষোভ তখন কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকতো। পরাজয়ের পর গালি খেলেও খেলোয়াড়রা জানতেন এটি খেলাধুলার প্রতি দর্শকদের অগাধ ভালোবাসা। বর্তমানে সেই আবেগের জায়গা দখল করেছে ব্যক্তিগত ঘৃণা ও রাজনৈতিক তকমা। মিঠুন বা শান্তর মতো ক্রিকেটারদের লক্ষ্য করে সামাজিক মাধ্যমে যে মন্তব্য করা হচ্ছে, তা খেলাধুলার জন্য রীতিমতো অশনি সংকেত। সাবেক এই অধিনায়ক আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমি অনেকদিন ক্রিকেটের সঙ্গে আছি। ক্লাব ক্রিকেট খেলেছি মোহামেডান, আবাহনী। আমরা হেরেছি এবং দর্শকদের গালি আর গণরোষের মুখে দুই ঘণ্টা মাঠ থেকে বের হতে পারিনি। কিন্তু সেটা ছিল পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করে। ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে এমনটা আগে দেখিনি। এটি ঠিক না।’
এই পরিবর্তন ক্রিকেটের সুস্থ পরিবেশকে কলুষিত করছে। সিলেটে বিপিএলের সময় ও সম্প্রতি রাজশাহীর স্টেডিয়ামে বিসিএলের ম্যাচ চলাকালে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বিশ্লেষণে এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষ করে দর্শকদের আচরণ এমন ছিল যে তারা যেন ক্রিকেটারদের ‘ভিলেন’ সাজানোর চেষ্টাই করছে। রাজশাহীতে মিঠুন যখন প্রতিবাদ করেছেন, তখন গ্যালারি সাময়িক নীরব হলেও পরক্ষণেই আবার শুরু হয় নোংরামি। ৫ই আগস্ট ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে সাকিব আল হাসান, মাশরাফি বিন মুর্তজা ও তামিম ইকবালকে নিয়ে চলমান অস্থিরতার রেশ ধরে অন্য ক্রিকেটারদের হেনস্তা করা এখন নিয়মিত ঘটনা। এই পরিস্থিতি ক্রিকেটারদের মাঠের মনোযোগ নষ্ট করছে। এটি এক ধরনের মানসিক ট্রমার জন্ম দিচ্ছে। বাশার ব্যক্তিগত আক্রমণের কড়া সমালোচনা করে বলেন, ‘আমি ইন জেনারেল বলছি, শুধু মিঠুন নয়। কোনো ইন্ডিভিজুয়ালকে এভাবে আক্রমণ করা ঠিক না। পারফরম্যান্স নিয়ে সমালোচনা করার অধিকার দর্শকদের আছে। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ কোনোভাবেই কাম্য নয়।’ মাঠের বাইরের দ্বন্দ্বকে মাঠের ভেতরে নিয়ে আসা ক্রিকেটীয় চেতনার পরিপন্থী।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে মাঠের প্রতিটি আচরণ নিমিষেই সারা বিশ্বে পৌঁছে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের একটি মর্যাদা রয়েছে। দর্শকদের এই আচরণ তা সরাসরি ক্ষুন্ন করছে। ক্রিকেটারদের ‘দালাল’ বলে সম্বোধন করা মূলত জাতিকেই ছোট করার শামিল। বিদেশের মাঠে যখন এই সংবাদগুলো প্রচারিত হয়, তখন আমাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হয়। যারা এই ধরনের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত, বাশার তাদের প্রকৃত ক্রিকেটভক্ত হিসেবে মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে যেকোনো ঘটনা মুহূর্তে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। আপনি এসব করে নিজের দেশকে অপদস্থ করছেন। আমাদের ক্রিকেটের ইমেজ বাইরে নষ্ট হচ্ছে। যারা এটা করছে তারা আসলে বাংলাদেশের ক্রিকেটের ভালো চায় না। মাঠের বাইরের বিষয় মাঠে আনা উচিত না।’
এই হীনমন্যতা আমাদের ক্রিকেটের উন্নতির পথে বড় বাধা। গ্যালারির এই বিশৃঙ্খলা দমনে বাংলাদেশ ক্রিকেট লীগ বিসিবি’র কঠোর পদক্ষেপ নেয়া এখন সময়ের দাবি। দায়সারা বিবৃতির বাইরে গিয়ে বিসিবিকে গ্যালারির নিরাপত্তা ও খেলোয়াড়দের সম্মান রক্ষায় সক্রিয় হতে হবে। তবে বাশার মনে করেন, পরিবর্তনটা আসতে হবে সমর্থকদের মনস্তত্ত্ব থেকে। প্রকৃত ক্রিকেটপ্রেমীরা কখনোই একজন খেলোয়াড়কে এভাবে অসম্মান করতে পারেন না। বিসিবিকে নিয়ে বাশারের অভিমত, ‘বিসিবি নিশ্চয়ই অফিশিয়ালি কিছু করবে। তবে পরিবর্তনটা আমাদের ভেতর থেকে আসা উচিত। আমরা আসলে এরকম না। আমরা যারা প্রকৃত ক্রিকেট ফ্যান, তারা হারলেও দলের পাশে থাকি। এখন যা দেখছি, এরা আসলে প্রকৃত ক্রিকেট ফ্যান নয়।’

Ayad
৩ মাস আগেThis culture start by 2 board directors Nazmul & asif Akbar,