বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজিত হলেও আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা জানাতে রোববার লাখ লাখ সমর্থক রাজধানী বুয়েনস আয়ারসের প্রতীকী ওবেলিস্ক চত্বরে জড়ো হন। দলের দুর্দান্ত বিশ্বকাপ অভিযানকে সম্মান জানিয়ে তাদের একটাই বার্তা ছিল- ‘গ্রেসিয়াস ইগুয়ালেস’। অর্থাৎ তবুও ধন্যবাদ। এ খবর দিয়ে আর্জেন্টিনার পত্রিকা বুয়েন্স আয়ারস টাইমস লিখেছে, শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত সমর্থকরা আরেকটি নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের আশায় ছিলেন। তবে অতিরিক্ত সময়ে স্পেনের ১-০ গোলের জয়ের পর হতাশার জায়গা দ্রুতই দখল করে নেয় গর্ব ও কৃতজ্ঞতা। অনেকেই এটিকে আরেকটি স্মরণীয় বিশ্বকাপ অভিযান হিসেবে অভিহিত করেন।
খেলা শুরুর কয়েক ঘণ্টা আগেই ওবেলিস্কে জড়ো হওয়া জনতা প্রথমে কিছুক্ষণ নীরব থাকলেও পরে দলের সম্মানে গান গাইতে শুরু করেন। ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী লুসিয়ানো ওর্তেগা বলেন, আমরা ফাইনালে উঠেছি, এটাও কিন্তু ছোট কোনো অর্জন নয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও সমর্থক সেখানে ভিড় করেন। পরাজয়ের পরও পুরো এলাকাজুড়ে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। ঢোলের তালে তালে স্লোগান, গাড়ির হর্ন, আতশবাজি ও পটকার শব্দে মুখর হয়ে ওঠে চত্বর। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, অসংখ্য ধন্যবাদ, খেলোয়াড়রা! তোমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়েছ। আর্জেন্টিনা সবসময় সেরাদের কাতারেই থাকবে।
বুয়েন্স আয়ারসের অন্য এলাকাগুলো তুলনামূলক ফাঁকা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে সমর্থকদের ছোট ছোট সমাবেশ দেখা যায়। ৩৭ বছর বয়সী মোটরসাইকেল কুরিয়ার মার্কো মোয়া, যিনি পরিবারের সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁর বাইরে বড় পর্দায় খেলা দেখেছিলেন, অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, যাই হোক, ধন্যবাদ। ধন্যবাদ, আর্জেন্টিনা। শহরের ক্যাবালিতো এলাকার একটি ক্যাফেতে শেষ বাঁশির পর দর্শকরা নীরবে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাদের জন্য মেনে নেয়া কঠিন ছিল যে এবার উদ্যাপনের পালা স্পেনের।
ইংল্যান্ডকে হারানোর স্মৃতি এখনও গর্বের
সেমিফাইনালে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় জয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। অনেক সমর্থকের কাছে এই জয়ের বিশেষ তাৎপর্য ছিল। কারণ মালভিনাস (ফকল্যান্ড) দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বৃটেনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার ঐতিহাসিক পারফরম্যান্স এখনও তাদের স্মৃতিতে অমলিন। লুসিয়ানো ওর্তেগা বলেন, অনেকেই ইংল্যান্ডকে হারিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন। স্পেনের কাছে হারলেও আমরা অন্য সবাইকে হারিয়েছি। এক অর্থে এটাও বিজয়। কারণ আর্জেন্টিনা আবারও প্রমাণ করেছে যে তারা বিশ্বের সেরাদের অন্যতম।
ফাইনাল শেষ হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে একটি মিম ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২ সালের তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের পাশাপাশি মালভিনাস দ্বীপপুঞ্জের অবয়ব এবং ১৫ জুলাই ২০২৬Ñইংল্যান্ডকে হারানোর তারিখ যুক্ত করা হয়। বুয়েন্স আয়ারসের পালের্মো এলাকায় শেষ বাঁশির পর দীর্ঘ করতালি ও ‘আর্জেন্টিনা, আর্জেন্টিনা’ ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পরিবেশ। ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী নাহুয়েল তুদেলা বলেন, আমি দুঃখিত। কিন্তু আমি দলকে, বিশেষ করে লিওনেল মেসিকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনি আমাদের জন্য সবকিছু উজাড় করে দিয়েছেন।
রোজারিওতেও মেসির জন্য কৃতজ্ঞতা
মেসির জন্মশহর রোজারিও রাজধানী বুয়েন্স আয়ারস থেকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। সেখানে শত শত মানুষ মোনুমেন্তো নাসিওনাল আ লা বান্দেরা স্মৃতিস্তম্ভে জড়ো হয়ে দলকে অভিনন্দন জানান। আর্জেন্টিনার জাতীয় রঙে আলোকিত স্মৃতিস্তম্ভের চারপাশে সমর্থকরা পতাকা নাড়েন, জাতীয় দলের জার্সি পরেন এবং মেসির ছবি হাতে নিয়ে আতশবাজির আলোয় উদ্যাপন করেন। পরিবারসহ উপস্থিত সের্হিও ইরাসাবাল বলেন, আমরা তো ইতিমধ্যেই একটি বিশ্বকাপ জিতেছি। শুধু কাঁদার কিছু নেই, উদ্যাপনও করা উচিত। মেসিই আমাদের বিশ্বসেরা বানিয়েছেন। প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র জানিয়েছেন, আর্জেন্টিনা দলের বিমান সোমবার স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় বুয়েন্স আয়ারসে পৌঁছানোর কথা। পরাজয়ের পরও অনেক সমর্থক জানিয়েছেন, দলকে স্বাগত জানাতে তারা আবারও রাস্তায় নামবেন।
লুসিয়ানো ওর্তেগা বলেন, ওরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সর্বস্ব দিয়ে লড়েছে। শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত হাল ছাড়েনি। তাই অবশ্যই আমরা তাদের বরণ করে নিতে যাব। এটাই তো ফুটবল। আমরা কখনোই তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেব না। প্রেসিডেন্ট মিলেই আরও ঘোষণা দিয়েছেন, খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফ যেদিন সমর্থকদের সঙ্গে রানার্সআপ হওয়ার অর্জন উদ্যাপন করতে চাইবেন, সেদিন জাতীয় ছুটি ঘোষণা করা হবে।
বুয়েন্স আয়ারসের শ্রমজীবী এলাকা বারাকাসে প্রায় ৩০ জন বন্ধু, যারা পুরো বিশ্বকাপজুড়ে প্রতিটি ম্যাচ একসঙ্গে ঐতিহ্যবাহী আসাদো (বারবিকিউ) খেতে খেতে দেখেছেন, ফাইনালের দিনও ঠা-া ও বৃষ্টি উপেক্ষা করে একত্রিত হন। পরাজয়ের পর ছিল কান্না আর হতাশা। তবে টেলিভিশনের ক্যামেরায় যখন লিওনেল মেসিকে দেখানো হয়, তখন সবাই দাঁড়িয়ে করতালি দেন এবং একসঙ্গে চিৎকার করে বলেন-
‘ধন্যবাদ, লিও!’
