ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে অংশ নেয়া শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বিএনপি সরকার গঠনের পর প্রথমবারের মতো শরিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসবেন তারেক রহমান। বৈঠকে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পাশাপাশি জাতীয় সরকার গঠন নিয়ে বিএনপি’র প্রতিশ্রুতি, শরিকদের সঙ্গে বিএনপি’র পথচলার ধরন, রাজনৈতিক এবং সরকারের কর্মকাণ্ডসহ নানা ইস্যুতে আলোচনা করবেন। ওদিকে ক্ষোভ ও অসন্তোষ নিয়ে বৈঠকে যাবেন শরিক দলের নেতারা। ইতিমধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) বৈঠকে না যাওয়ার বিষয়ে দলীয়ভাবে সিদ্ধান্তও নিয়েছে।
আজ সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এই বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠক নিয়ে যুগপৎ আন্দোলনের বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা হয়েছে মানবজমিনের। তারা জানিয়েছেন, কার্ডে লেখা আছে শুভেচ্ছা বিনিময়। তবে শুভেচ্ছা বিনিময় লেখা থাকলেও মূলত রাজনৈতিক বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হবে। নেতারা তাদের ক্ষোভ এবং অসন্তোষের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করবেন। বিএনপি’র প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়েও প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে। একই সঙ্গে শরিক দলের নেতারা বিএনপি’র চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চাইবে যে, বিএনপি’র সঙ্গে জোট শরিকদের জার্নি কতোদূর? এই জার্নি কি আজকের বৈঠকের মধ্যদিয়ে শেষ হবে? যদি পথচলা এই বৈঠকের মধ্যদিয়ে শেষ না হয়, তাহলে এর ধরন কেমন হবে-সে বিষয়টি বৈঠকে মীমাংসা করার উপর গুরুত্ব আরোপ করবেন জোট নেতারা।
গণতন্ত্র মঞ্চের শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক মানবজমিনকে বলেন, সরকার গঠনের পর অনেক বিষয়ে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছে বলে আমি বৈঠকে বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবো। একই সঙ্গে সরকার ভালো কাজ করলেও কিছু ক্ষেত্রে, যেমন বাণিজ্য চুক্তিসহ কয়েকটি বিষয় গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এসব বিষয়েও আমি বৈঠকে আলোচনা করবো। পাশাপাশি বিএনপি’র প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হতে পারে।
গণফোরামের সভাপতি এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য ডেকেছেন। সেখানে যাওয়ার পরেই আলোচনার বিষয়ে আমরা জানতে পারবো। ওদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরিকদের মধ্যে আসন বণ্টন নিয়ে অনেক দলের অসন্তুষ্টি রয়ে গেছে। সেই বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হতে পারে। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে করণীয় সম্পর্কে শরিকদের পরামর্শ শুনবেন। দেশকে এগিয়ে নিতে একসঙ্গে পথচলা এবং কাজ করতে সবার সহযোগিতা প্রধানমন্ত্রী কামনা করবেন বলেও সূত্রে জানা গেছে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলের দু’জন নেতা মানবজমিনকে জানিয়েছেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি জোট শরিক দলগুলোকে দিয়েছিল, তা নির্বাচনের সময় এবং নির্বাচনের পরবর্তীতে তারা রক্ষা করেনি। এই জোটের সঙ্গে মূল প্রতিশ্রুতি ছিল সবাইকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন। সেই প্রতিশ্রুতিও বিএনপি এখন পর্যন্ত রক্ষা করেনি। এসব বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হতে পারে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (বিএলডিপি) বিলুপ্ত করেন দলের চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম। তিনি দল বিলুপ্ত করে বিএনপি থেকে মনোনয়ন নিয়ে লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ) আসন থেকে নির্বাচন করেন। বিএলডিপি’র সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিমকেও এই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যদিও এখন তিনি বিএনপি’র সংসদ সদস্য। তিনি মানবজমিনকে জানান, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য এই বৈঠক ডাকা হয়েছে।
বৈঠকে যাবে না জেএসডি: প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের দলগুলোর বৈঠকে না যাওয়ার বিষয়ে দলীয়ভাবে জেএসডি সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে মানবজমিনকে জানিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন। এ বিষয়ে দলটি লিখিতভাবেও জানিয়েছে।
গত ১৬ই জুলাই শহীদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপনের স্বাক্ষরে ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, সমপ্রতি টেলিফোনে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানানোর যে সৌজন্য আপনারা দেখিয়েছেন, তার জন্য আমরা আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে সংলাপ, পারস্পরিক সম্মান, রাজনৈতিক সৌজন্য এবং মতপার্থক্যের মধ্যেও যোগাযোগের ধারাবাহিকতা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) সব সময়ই এই মূল্যবোধকে ধারণ ও চর্চা করে এসেছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় জুলাই সনদ, গণভোট এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে আমাদের অবস্থানকে আমরা কেবল একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে নয়, বরং জনগণের প্রতি একটি নীতিগত ও ঐতিহাসিক অঙ্গীকার হিসেবে বিবেচনা করি। আমাদের বিশ্বাস, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান, জনগণের প্রত্যক্ষ মতামত এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের আকাঙ্ক্ষা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন বাস্তবতা ও নতুন দায়িত্বের জন্ম দিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রশ্নে একটি সুস্পষ্ট জাতীয় অবস্থান ও রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে ওঠার পূর্বে বিএনপি’র সঙ্গে পৃথক রাজনৈতিক বৈঠকে অংশগ্রহণ আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান, অগ্রাধিকার এবং জনগণের কাছে প্রদত্ত অঙ্গীকার সম্পর্কে অনাকাঙ্ক্ষিত বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে। আমরা মনে করি, এই মুহূর্তে আমাদের রাজনৈতিক দায়িত্ব হলো রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত রাখা। এই বিবেচনায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এই মুহূর্তে বিএনপি’র সঙ্গে প্রস্তাবিত বৈঠকে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, তবে আমরা একই সঙ্গে বিশ্বাস করি যে, জাতীয় সংকট, রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ, গণভোট এবং দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বন্দোবস্ত সম্পর্কিত মৌলিক প্রশ্নসমূহে যদি রাষ্ট্র বা সরকারের উদ্যোগে সকল রাজনৈতিক শক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি সর্বদলীয় বা জাতীয় সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তাহলে জেএসডি সেখানে তার নীতিগত অবস্থান জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে প্রস্তুত থাকবে।
