বেহাল দশায় ১৪শ’ শিক্ষক ৫৫০০০ শিক্ষার্থী

নবীনগরে প্রাথমিক শিক্ষার হাল

বেহাল দশায় ১৪শ’ শিক্ষক ৫৫০০০ শিক্ষার্থী

ফন্ট সাইজ:

থাকার কথা ১১ জন সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার। সেখানে আছেন মাত্র ১ জন। একজন হিসাব সহকারী ছাড়া অফিসে করণিক পদে আর কেউ নেই। এমনকি পিয়নও নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের লোকবলের বর্তমান চিত্র এটি। এই অবস্থায় বলতে গেলে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের ভবনটিই দাঁড়িয়ে আছে শুধু। শিক্ষা কর্মকর্তা বা অফিস স্টাফের অভাবই নয়, বিদ্যালয়গুলোতে প্রকট শিক্ষক সংকটও বিদ্যমান। ২১৯ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক আছেন মাত্র ৬৯ জন। প্রধান শিক্ষকের দেড়শ’ পদই শূন্য। ফলে জেলার বৃহৎ এই উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা লাঠে উঠেছে।

উপজেলা কমপ্লেক্সের প্রবেশ মুখে তিনতলা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসটি দেখলে পরিত্যক্ত একটি ভবন মনে হয়। মানুষের আনাগোনা নেই। দু’টি কক্ষ ছাড়া বাকি সব কক্ষ তালাবদ্ধ। শিক্ষকরা এসে ফাইলপত্র নিয়ে নিজেদের কাজ নিজেরাই করছেন। টেবিলে ফাইলের স্তূপ। জনবল কাঠামো অনুসারে একজন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ছাড়াও এখানে থাকার কথা ১১ জন উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার ১০টি পদই শূন্য। ফলে ২১৯ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১৪শ’ শিক্ষক আর প্রায় ৫৫ হাজার শিক্ষার্থীকে দেখার কেউ নেই এখানে। দাপ্তরিক কাজকর্ম করার কোনো লোকও নেই। উচ্চমান সহকারীর একমাত্র পদটি শূন্য। অফিস সহকারী কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিকের ৩টি পদই ফাঁকা। অফিস সহায়কের ১ জনের পদও শূন্য। গত কয়েক মাস ধরে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকলেও অফিসের করণিক পদগুলো শূন্য ২ বছর ধরে। সবমিলিয়ে বেহাল এই উপজেলায় প্রাথমিক শিক্ষা। অতিরিক্ত কাজের চাপে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন অফিসের হিসাব সহকারী আবু হানিফ। নানা রোগে কাবু অফিসের এই কর্মচারী শারীরিকভাবে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, ২০১২ সালে এখানে যোগদান করার সময় ৪ জন ছিলাম আমরা। তখন শিক্ষক সংখ্যা কম ছিল। ৫-৬শ’ শিক্ষক ছিল। আইটি ব্যাজ এত কাজ ছিল না। ৪ জনে সুন্দর-সুচারুভাবে অফিস পরিচালনা করতে পেরেছি। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ৩ জন অবসরে চলে যাওয়ার পর আমরা আরও ২ জন ছিলাম। ২০২৪ সাল পর্যন্ত দু’জনে অফিস চালিয়েছি। অফিস প্রধান ইউডি কাম অ্যাকাউন্ট্যান্ট বদলি হয়ে চলে যান কুমিল্লায়। এরপর থেকে ২ বছর ধরে আমি একা আছি। এখন ২১৯টি স্কুল।

প্রায় ১৪শ’ শিক্ষক। ১শ’ জন দপ্তরি। দেড় হাজার জনবলের প্রশাসনিক-আর্থিক যাবতীয় কাজ আমাকে একা সামলাতে হচ্ছে। যে কারণে আমার স্বাস্থ্যের ওপর অনেক প্রেসার পড়তেছে, ব্রেনের ওপর প্রেসার পড়ছে। এখানে প্রচুর কাজ। যে কাজগুলো আসলে সমাধা করা এই অসুস্থ শরীর নিয়ে আমার পক্ষে সম্ভব না। ৪টা পদ পূরণ না হলে শিক্ষার মান উন্নয়ন কিছুতেই সম্ভব নয়। আতিয়ারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুল খালেক বলেন, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অনেক সমস্যা। ১১ জন সহকারী শিক্ষা অফিসারের প্রয়োজন। ওই জায়গায় একজন সহকারী শিক্ষা অফিসার দিয়ে গোটা নবীনগরের কার্যক্রম চলছে। ২১ ইউনিয়নে বিদ্যালয় পরিদর্শন একজনের পক্ষে কাভার করা খুবই কষ্টকর। বিভিন্ন উপজেলা থেকে লোকজন এনে অফিসিয়াল কাজ করতে হয়। আমরা শিক্ষকরা অফিসিয়াল কাজের জন্য অনেক দুর্ভোগ ভোগ করছি। যেটা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। নবীনগরে এমন কোনো নজির ছিল না অফিসিয়াল কাজে এসে ২ ঘণ্টা, ৫ ঘণ্টা, ৭ ঘণ্টা বসে থাকা বা কাজ হবে না, আরেকদিন আসতে হবে। এ রকম কোনো নজির ছিল না। আমি ৩৮ বছর ধরে শিক্ষকতা করে আসছি। আমার জানামতে এমন দুর্ভোগ শিক্ষা অফিসে কোনো সময় পায়নি।

গোসাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোছাম্মৎ তাসলিমা জাহান জানান, আমাদের অফিসে স্টাফের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে। সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য। প্রশাসনিক কাজ করতে ঝামেলা পোহাতে হয়। স্যার ভিজিটে থাকে। অফিসে অপেক্ষা করতে হয়। অভাব-অভিযোগ ঠিকমতো উপস্থাপনও করতে পারি না। শ্যামগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ডালিয়া সুলতানা বলেন, সহকারী শিক্ষা অফিসার ১১ জনের জায়গায় ১ জন আছেন, সমস্যা তো হবেই। অফিসে আগে ৫-৭ জন ক্লার্ক ছিল। দাপ্তরিক কাজে সমস্যা হয় আমাদের। আশ্রাফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আরজুদা বেগম বলেন, আমাদের উপজেলা ২১ ইউনিয়ন নিয়ে। এটিইও (উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার) দরকার ১১ জন। আমাদের ৮টা সাব-ক্লাস্টার। ন্যূনতম তো ৮টা সাব-ক্লাস্টারের জন্য ৮ জন এটিইও দরকার। আছে মাত্র ১ জন। প্রাতিষ্ঠানিক বলেন আর পড়ালেখা বলেন- অনেক অসুবিধা। শারীরিক অসুস্থতায় উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রয়েছেন ছুটিতে। উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. মানিক ভূঁইয়া একাই সামলাচ্ছেন সব। তিনি জানান, ৭ মাস ধরে সহকারী শিক্ষা অফিসার হিসেবে একাই দায়িত্ব পালন করছেন। অফিস স্টাফের পদও শূন্য। এতে কাজে অনেক সমস্যা হচ্ছে। তাছাড়া ২১৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ১৫০ বিদ্যালয়েই নেই প্রধান শিক্ষক। সহকারী শিক্ষকের পদও দেড়শ’র মতো শূন্য রয়েছে বলে জানান তিনি।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন