কোথায় ছিলেন এই ‘বুম সাকালাকা’!

কোথায় ছিলেন এই ‘বুম সাকালাকা’!

ফন্ট সাইজ:

মেঘলা আকাশ আর তপ্ত মায়ামি স্টেডিয়ামের গুমোট হাওয়া যেন দুই শিবিরের মনের ক্ষোভটাই উগরে দিচ্ছিল। আর্জেন্টিনার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গের পর ইংল্যান্ডের সামনে ছিল কেবলই সান্ত্বনার ব্রোঞ্জ মেডেলের লড়াই। কিন্তু কে জানতো, ফ্রান্সের বিপক্ষে সান্ত্বনার এই মঞ্চই রূপ নেবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম পাগলাটে, রোমাঞ্চকর আর গোলবন্যার এক মহাকাব্যে! ফরাসিদের ৬-৪ গোলে হারিয়ে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করলো ইংল্যান্ড। ১৯৬৬তে বিশ্বজয়ের পর ইংলিশদের সেরা সাফল্য এটিই।

কিন্তু ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মায়ামির সব আলো যখন হ্যাটট্রিক হিরো বুকায়ো সাকার ওপর, তখনই ফুটবল বিশ্বের আকাশে ভাসছে কোটি টাকার এক প্রশ্ন- আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালের সেই মহাগুরুত্বপূর্ণ রাতে এই খ্যাপাটে সাকা কোথায় ছিলেন? কেন তাকে বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছিলেন থমাস টুখেল? ম্যাচ শেষে আর্সেনাল উইঙ্গার যখন ব্রোঞ্জ মেডেল গলায় ঝুলিয়ে বিবিসি’র মাইকের সামনে দাঁড়ালেন, তখন তার চোখেমুখে আনন্দের চেয়ে যেন জেদটাই বেশি ফুটে উঠছিল। টুখেলের ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্তের বলি হওয়া সাকা সরাসরিই বললেন, ‘অবশ্যই আমি (বিশ্বকাপে) আরও বেশি খেলতে চেয়েছিলাম। তবে এসব নিয়ে কথা বলার উপযুক্ত সময় এখন নয়। আমি মাঠেই নিজের জবাবটা দিতে চেয়েছিলাম। যা হওয়ার হয়ে গেছে, এখন সামনে তাকাতে হবে।’ সাকা পরিষ্কার জানিয়ে দেন, কোনো চোটের বাহানা নয়, তিনি ‘শতভাগ ফিট’ ছিলেন।

অথচ আলবিসেলেস্তেদের বিপক্ষে সেমিফাইনালে সাকাকে বসিয়ে মর্গান রজার্সকে নামান টুখেল। ম্যাচ শেষে যখন জার্মান কোচের দিকে তির্যক প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া হলো, তখন তিনি যে অজুহাত দিলেন তা একপ্রকার অবিশ্বাস্য। টুখেল বলেন, ‘সাকা সব ঠিকঠাকই করেছিল। তবে সেমিতে মর্গান রজার্সকে নিয়ে আমার ভেতর একটা ‘গাট ফিলিং’ (অনুভূতি) কাজ করছিল যে, সে বিশেষ কিছু করবে। ব্যস, এটুকুই!’ ম্যাচের গোলবন্যার ঘোরে থাকা টুখেল এমনকি এটাও জানতেন না যে, সাকার হ্যাটট্রিক হয়ে গেছে! অথচ টুর্নামেন্টে মাত্র ১৯২ মিনিট খেলেই ৩টি গোল আর ৩টি অ্যাসিস্ট নিয়ে ইংল্যান্ডের সবচেয়ে কার্যকর ফরোয়ার্ড ছিলেন এই সাকা। হ্যারি কেইন বা জুড বেলিংহ্যামের মতোই যিনি দলের সবচেয়ে বড় ভরসা, তাকে সেমির মতো মঞ্চে কেবল কোচের ‘মনে হয়েছিল’ বলে বসিয়ে রাখা যে টুখেলের ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় ব্লান্ডার, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

ম্যাচের শুরু থেকেই ইংল্যান্ড যেন একটা পয়েন্ট প্রমাণ করতে মাঠে নামে। টুখেল সেমির অতি-রক্ষণাত্মক কৌশল ঝেড়ে ফেলে রজার্স, এজে, সাকা আর রাশফোর্ডকে নিয়ে এক ভয়ঙ্কর আক্রমণভাগ সাজান। ম্যাচের ২ মিনিট ১৪ সেকেন্ডে ডেকলান রাইসের গোলে এগিয়ে যায় থ্রি লায়নরা। ১৯৮২তে ব্রায়ান রবসনের এই ফ্রান্সের বিপক্ষেই ২৮ সেকেন্ডের গোলের পর এটি ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে দ্রুততম গোল। ১৮ মিনিটে রাইসের কর্নার থেকেই হেডে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এজরি কোনসা। প্রথমার্ধে ফরাসি রক্ষণভাগকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দেয় ইংল্যান্ড। ৩৭ মিনিটে রজার্সের পাস থেকে প্রথম গোল এবং প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে এবেরেচি এজের পাস থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করে দলকে ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন সাকা। মাঠের ভেতর কিলিয়ান এমবাপ্পে তখন অসহায়ভাবে হাসছেন, আর ডাগআউটে দিদিয়ের দেশমকে দেখাচ্ছিল চূড়ান্ত বিধ্বস্ত। ১৪ বছরের ফরাসি কোচিং ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটা এভাবে শেষ হবে, তা হয়তো ভাবেননি তিনি।

কিন্তু ফুটবল ঈশ্বর বোধহয় নাটকীয়তার সবটুকু জমিয়ে রেখেছিলেন দ্বিতীয়ার্ধের জন্য। বিরতির পর উসমান দেম্বেলে ও ব্র্যাডলি বারকোলাকে নামিয়ে চাল চালেন দেশম। আর তাতেই ম্যাচের চেহারা পাল্টে যায়। থ্রি লায়নদের রক্ষণভাগের চিরাচরিত ‘বোতলজাত’ হওয়ার রোগ আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে।

৪৮ মিনিটে মাইকেল ওলিসের পাস থেকে এমবাপ্পে প্রথম গোল করার পর ৫৪ মিনিটে বারকোলা স্কোরলাইন করেন ৪-২। ৬৬ মিনিটে ওলিসের সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ান খেলে বক্সের প্রান্ত থেকে এমবাপ্পে যখন নিজের দ্বিতীয় গোলটি করলেন, তখন পুরো ইংল্যান্ড শিবির শিউরে ওঠে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেই সেমির কোলাপ্সের স্মৃতি মনে করে। ৪-০ থেকে ম্যাচ তখন ৪-৩! এই জোড়া গোলের মাধ্যমে কিলিয়ান এমবাপ্পে ১৯৭০ সালে গার্ড মুলারের পর প্রথম পুরুষ ফুটবলার হিসেবে এক বিশ্বকাপে দুই অঙ্ক (১০টি) ছোঁয়ার কীর্তি গড়েন। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও সবার ওপরে উঠে যান এই রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকে টুখেল যখন তার শিষ্যদের বোঝাচ্ছিলেন, তখন ইংলিশ ফুটবলারদের চোখেমুখে স্পষ্ট ছিল ট্রমা। ওলিসে যদি সমতা ফেরানোর সহজ সুযোগটি নষ্ট না করতেন, তবে গল্পটা অন্যরকম হতে পারতো।

তবে ম্যাচের ৮৭ মিনিটে ডিজেড স্পেন্সের কল্যাণে পেনাল্টি পায় ইংল্যান্ড। স্নায়ুচাপ ধরে রেখে ঠাণ্ডা মাথায় স্পট কিক থেকে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন সাকা (৫-৩)। নাটকের তখনো বাকি ছিল। ইনজুরি টাইমের পঞ্চম মিনিটে দেম্বেলে ফ্রান্সের হয়ে চতুর্থ গোল করলে আবার আশা জাগে ফরাসিদের। তবে তার ঠিক দুই মিনিট পর, বদলি হিসেবে নামা জুড বেলিংহ্যাম টুর্নামেন্টে নিজের সপ্তম গোলটি করে ফ্রান্সের ম্যাচে ফেরার আশায় পানি ঢেলে দেন। ১৯৬৬ সালের পর এটাই ইংল্যান্ডের সেরা বিশ্বকাপ যাত্রা। তবে এই জয় টুখেলকে কাঠগড়া থেকে পুরোপুরি মুক্তি দিচ্ছে না। ম্যাচের শেষ ১৫ মিনিটে যেভাবে ইংল্যান্ডের ডিফেন্স তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছিল, তা আগামী ইউরো ২০২৮-এর আগে টুখেলের রণকৌশল নিয়ে প্রশ্ন তুলবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন