কখনো কখনো একটি ফুটবল ম্যাচ আর শুধু ফুটবল থাকে না। নব্বই মিনিটের সীমানা ছাড়িয়ে সেটি হয়ে ওঠে ইতিহাসের এক অমোঘ অধ্যায়। সেখানে জয়-পরাজয়ের হিসাব ম্লান হয়ে যায়; বড় হয়ে ওঠে একজন মানুষের স্বপ্ন, একটি জাতির আবেগ, কোটি মানুষের ভালোবাসা আর সময়কে হার মানানোর আকাঙ্ক্ষা। এবারের বিশ্বকাপের ফাইনাল ঠিক তেমনই এক রাতের অপেক্ষায়। একদিকে স্পেনের তারুণ্যের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার আকাশে শেষবারের মতো জ্বলে ওঠার অপেক্ষায় এক নক্ষত্র- লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। হয়তো এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। হয়তো শেষ বারের মতো বিশ্বমঞ্চে নীল-সাদা জার্সি গায়ে হাঁটবেন তিনি। তাই এই ম্যাচের নাম শুধু ফাইনাল নয়; এটি একজন শিল্পীর শেষ তুলির আঁচড়, এক মহাকাব্যের শেষ পৃষ্ঠা, এক কিংবদন্তির অমরত্বের শেষ লড়াই।
দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ফুটবলকে শুধু খেলেননি, তাকে কবিতায় রূপ দিয়েছেন। তার বাঁ পায়ের স্পর্শে বল কখনও সুর তুলেছে, কখনও রঙিন স্বপ্ন এঁকেছে। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ ভেঙেছে তার ড্রিবল, আবার কোটি মানুষের হৃদয় ভেঙেছে তার অশ্রু।
একদিন এই মানুষটিকেই শুনতে হয়েছে- দেশের জন্য কী জিতেছেন? ম্যারাডোনার পাশে দাঁড়ানোর অধিকার কি তার আছে? ২০১৪ সালের মারাকানায় বিশ্বকাপ ছুঁয়েও হারিয়ে যাওয়া, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়, অবসরের ঘোষণা- সবকিছু যেন ছিল এক অসমাপ্ত ট্র্যাজেডির অধ্যায়। কিন্তু মহান শিল্পীরা কখনও অসমাপ্ত গল্প রেখে যান না। তিনি ফিরেছিলেন। আরও দৃঢ় হয়ে, আরও নীরব হয়ে। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকার ট্রফি হাতে প্রথমবারের মতো হাসলেন। তারপর ২০২২ সালের কাতারে পৃথিবী দেখলো এক পূর্ণতার ছবি। লুসাইলের আকাশের নিচে বিশ্বকাপ ট্রফি বুকে জড়িয়ে ধরা মেসির সেই ছবি ইতোমধ্যেই ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর প্রতীকগুলোর একটি। সেখানেই গল্প শেষ হতে পারতো। কিন্তু কিছু কিংবদন্তি নিজের শেষ অধ্যায় নিজেই লেখেন।
৩৯ বছরের এক ‘যুবক’ ফুটবল বিশ্বকে বুঁদ করে রেখেছেন। চলতি বিশ্বকাপেও তাঁর জাদু চলছেই। এখন তাঁর চোখ টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফিতে। একই সঙ্গে হাতছানি বিশ্বকাপের ফাইনালে সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতা হওয়ারও। অধিকাংশ ফুটবলার যখন বুটজোড়া তুলে রাখেন, মেসি তখনো আরও উচ্চতার লড়াইয়ে। চলতি আসরে ইতিমধ্যে করে ফেলেছেন আট গোল। ৩৯ বছর বয়সে মেসি যেভাবে খেলে যাচ্ছেন, তা অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো। হয়তো শরীর আগের মতো দ্রুত নয়, কিন্তু ফুটবল এখনও তাঁর মস্তিষ্কের ভাষা বোঝে। একটি পাস, একটি স্পর্শ, একটি দৃষ্টি- মুহূর্তেই বদলে দিতে পারে ম্যাচের ভাগ্য। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে আবারও দেখা গেল সেই জাদু। সময় যেন তাঁর কাছে থমকে দাঁড়িয়েছিল। তরুণদের ভিড়ে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে শান্ত, সবচেয়ে প্রজ্ঞাবান, সবচেয়ে আলোকিত।
তিনি যেন ঝড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক বাতি ঘর নিজে আলো ছড়িয়ে শুধু পথই দেখান না, নিরাপদ গন্তব্যেও পৌঁছে দেন সবাইকে। তিনি ম্যারাডোনা নন, হওয়ার চেষ্টাও করেননি বোধহয়। ম্যারাডোনা ছিলেন বজ্রপাতের মতো বিস্ফোরক, মেসি নক্ষত্রের মতো অবিরাম আলো ছড়িয়ে যাওয়া এক মহাজাগতিক উপস্থিতি। এবার তার সামনে চিরচেনা স্পেন। নতুন প্রজন্মের প্রতীক। গতিময়, সাহসী, নির্ভীক। আর অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন এমন একজন, যার ক্যারিয়ারের গল্প পড়ে বড় হয়েছে আজকের অনেক ফুটবলার। তাই এই ফাইনাল যেন শুধু দুই দলের লড়াই নয়; এটি দুই সময়ের মুখোমুখি দাঁড়ানো। আগামী দিনের ফুটবল বনাম ফুটবলের এক চিরন্তন শিল্পী। ফুটবলে পরিসংখ্যানের মূল্য আছে। গোল, অ্যাসিস্ট, ট্রফি, ব্যালন ডি’অর সবই ইতিহাসের অংশ। কিন্তু কিছু জিনিস সংখ্যায় মাপা যায় না। মেসিকে ভালোবাসা কোটি শিশুর স্বপ্ন, তাঁর খেলা দেখে ফুটবল শেখা এক প্রজন্ম, কিংবা তার প্রতিটি স্পর্শে গ্যালারিতে উঠে আসা বিস্ময়ের ঢেউ- এসব কোনো পরিসংখ্যানের খাতায় লেখা থাকে না।
বিশ্বকাপ জিতুন বা না-জিতুন, লিওনেল মেসি অনেক আগেই ফুটবলের অমরদের কাতারে নিজের নাম লিখে ফেলেছেন। তবু মানুষের মন অদ্ভুত। শেষ দৃশ্যটি যদি নিখুঁত হয়, তবে পুরো গল্পটাই রূপকথায় পরিণত হয়। হয়তো শেষ বাঁশি বাজবে। হয়তো ক্লান্ত শরীরে ধীরে ধীরে হাঁটবেন তিনি। হয়তো একবার তাকাবেন গ্যালারির দিকে, তারপর আকাশের দিকে। সেই আকাশ, যেখানে একদিন দিয়েগো ম্যারাডোনার স্মৃতি ভেসে বেড়াতো। আজ সেখানে হয়তো আরেকটি নক্ষত্র স্থায়ী হয়ে জ্বলে উঠবে।
যদি সেই মুহূর্তে তার দুই হাতে থাকে সোনালি বিশ্বকাপ, তবে সেটি শুধু আরেকটি শিরোপা হবে না। সেটি হবে একজন মানুষের অধ্যবসায়ের বিজয়, একটি স্বপ্নের পূর্ণতা, একটি যুগের সমাপ্তি এবং ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর বিদায়গুলোর একটি। আর মেসি ফাইনালে যদি জিততে না পারেন? আজেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালো নি বলেছেন, আশা করি আমরা জিতবো, কিন্তু তা না হলেও মেসি সবার জন্য এক অনন্য উদাহরণ হয়েই থাকবে।
