মানবতাবিরোধী অপরাধে শামীম ওসমান-অয়নসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র সম্পন্ন

সিদ্ধিরগঞ্জে জুলাইয়ের রক্তাক্ত তিনদিন

মানবতাবিরোধী অপরাধে শামীম ওসমান-অয়নসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র সম্পন্ন

ফন্ট সাইজ:

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে মাত্র ৩ দিনের ব্যবধানে ২৮ জনকে হত্যা করা হয়। সংঘটিত এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে দাখিল করা অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপ। এতে বলা হয়েছে, ১৯শে জুলাই বিকালে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান। সেই কথোপকথনে ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম রোডের অংশটা আমার ওপর ছেড়ে দেন’ এবং ‘আন্দোলনে গেলে ঠিক হয়ে যাবে’ এমন বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে, ২১শে জুলাই অভিযান শেষে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ও নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন পুলিশ সুপারের মধ্যে বেতার যন্ত্রে হওয়া একটি কথোপকথনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে হাবিবুরকে এসপি গোলাম মোস্তফা রাসেলের উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায় ‘আমরা তোমাদের এলাকা পরিষ্কার করে দিয়ে গেলাম, তোমরা ধরে রাখো’। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই ফোনালাপের পরপরই শামীম ওসমান সিদ্ধিরগঞ্জের ব্যাপারী টাওয়ারে গিয়ে ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং আন্দোলন দমনে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ১৯শে থেকে ২১শে জুলাই ২০২৪ মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে চট্টগ্রাম রোড, জালকুড়ি, মিজমিজি, পাইনাদি, মৌচাক, সানারপাড় ও আশপাশের এলাকায় নিরস্ত্র আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উপর চালানো হয় পরিকল্পিত ও নির্বিচার গুলিবর্ষণ। এতে ২৮-এর বেশি মানুষ নিহত এবং ৪ জন জখমসহ অসংখ্য আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হন। এই ঘটনায় সাবেক এমপি শামীম ওসমান, তার ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়নসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ, ষড়যন্ত্র, প্ররোচণা ও নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, তৎকালীন সরকারের নির্দেশনা ও পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় আন্দোলন দমনের অংশ হিসেবে সিদ্ধিরগঞ্জে সংঘটিত এসব হামলা ছিল ব্যাপক, পদ্ধতিগত ও লক্ষ্য নির্ধারিত। এতে দাবি করা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাংশের সমন্বয়ে এসব হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। আগামী ২১শে জুলাই প্রসিকিউশন থেকে এ প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে দাখিল হতে পারে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯শে জুলাই তৎকালীন সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমান ও আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের মধ্যে হওয়া এক কথোপকথনের পর সিদ্ধিরগঞ্জে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা আরও জোরদার হয়। এরপর বিভিন্ন স্থানে দলীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে বৈঠক করে আন্দোলন প্রতিহতের নির্দেশনা দেয়া হয় বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

এরই ধারাবাহিকতায় ১৯শে জুলাই জালকুড়ি এলাকায় গুলিবর্ষণে সুজন খানসহ অন্তত ৪ জন নিহত হন। পরদিন ২০শে জুলাই অভিযোগ অনুযায়ী, শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে হামলায় নেতৃৃত্ব দেন। সেদিন সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় গুলিতে মিনারুল ইসলাম, জনি, ছায়েদুল, হৃদয় মিয়া, সজল মিয়াসহ অন্তত ১৬ জন নিহত হন এবং অসংখ্য মানুষ আহত হন। ২১শে জুলাইও থামেনি রক্তপাত। অভিযোগে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম রোড এলাকায় নির্বিচারে গুলিবর্ষণে মিলন হাওলাদার, মোনায়েল আহমেদ ইমরান, জনিসহ অন্তত ৮ জন নিহত হন। রক্তে ভেসে যায় সড়ক, আতঙ্কে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন আন্দোলনকারীরা।

মামলায় এ কে এম শামীম ওসমান, ইমতিনান ওসমান অয়ন, মজিবুর রহমান, হাজী ইয়াসিন, শাহ জালাল বাদল, নুর উদ্দিন, মতিউর রহমান মতি, রুহুল আমিন, মহসীন ভূঁইয়া, আমিনুল ইসলাম রাজু ও কাজী আমির হোসেনসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে নেতৃত্ব, নির্দেশ, ষড়যন্ত্র, প্ররোচণা ও সহায়তার মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এসব হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন বন্ধে অভিযুক্তরা কোনো ব্যবস্থা নেননি; বরং অভিযোগ অনুযায়ী, তারা ঘটনাগুলোর নেতৃত্ব ও সমন্বয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তদন্তে এসব ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের কয়েকটি ধারার অধীনে আসামিদের বিচারের জন্য তদন্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। আগামী ২১শে জুলাই এই প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে দাখিল করা হতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন