যেখানে পাসারেল্লা ও ম্যারাডোনার চেয়ে অনন্য মেসি

যেখানে পাসারেল্লা ও ম্যারাডোনার চেয়ে অনন্য মেসি

ফন্ট সাইজ:

আর্জেন্টিনার ফুটবলে অধিনায়কত্ব কখনোই শুধু একটি আর্মব্যান্ড ছিল না। এটি ব্যক্তিত্বের প্রতীক, দলীয় প্রভাব আর ইতিহাসের উত্তরাধিকার। এক প্রজন্ম দেখেছে ড্যানিয়েল পাসারেল্লার কঠোর কর্তৃত্ব, আরেক প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছে দিয়েগো ম্যারাডোনার ক্যারিশমা। সেই দুই কিংবদন্তির দীর্ঘ ছায়ার নিচে দাঁড়িয়ে লিওনেল মেসিকে খুঁজে নিতে হয়েছে নেতৃত্বের আপন ভাষা। আর আজ, মেসি প্রমাণ করেছেন নেতা হতে উচ্চকণ্ঠী হওয়া লাগে না; কখনো কখনো নীরবতাই সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। একসময় জাতীয় দলে মেসির নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নের অন্ত ছিল না । বার্সেলোনার জাদুকর আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে কেন একই প্রভাব ফেলতে পারেন না? এই প্রশ্ন বারবার ফিরে এসেছে। সমালোচকরা বলতেন, মেসি অসাধারণ ফুটবলার, কিন্তু জন্মগত নেতা নন। অথচ সময়ই সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে। এই রূপান্তরের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা কোচ লিওনেল স্কালোনির।

দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি মেসিকে বদলাতে চাননি; বরং বদলেছেন জাতীয় দলের সংস্কৃতি। স্কালোনি এমন এক ড্রেসিংরুম গড়ে তুলেছেন যেখানে অহংকারের জায়গা নেই। নেই সিনিয়র-জুনিয়রের অযথা বিভাজন। আছে কেবল দল, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং অভিন্ন লক্ষ্য। ফলে মেসির নেতৃত্বও স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয়েছে। শুধু নির্দেশনার বদলে নিজের আচরণ দিয়ে সতীর্থদের আস্থা অর্জন করেছেন তিনি। অনুশীলনের নিবেদন, ম্যাচের দায়ভার কাঁধে তুলে নেয়া কিংবা কঠিন মুহূর্তে শান্ত থাকা- সবমিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন দলের অবিসংবাদিত নেতা। রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ কিংবা ক্রিস্টিয়ান রোমেরোদের প্রজন্মের কাছে মেসি শুধু মহাতারকা নন; তিনি এমন একজন নেতা, যার জন্য অতিরিক্ত এক কদম দৌঁড়াতেও তারা প্রস্তুত। এই আস্থা কোনো জ্বালাময়ী বক্তৃতায় তৈরি হয়নি, তৈরি হয়েছে প্রতিদিনের অনুশীলন আর মাঠের লড়াইয়ে। আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে শেষবার এমন দৃশ্য দেখা গিয়েছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপে।

কোচ কার্লোস বিলার্দো পুরো দলকে গড়ে তোলেন ম্যারাডোনাকে কেন্দ্র করে। তবে সেই দল অনেকটাই নির্ভরশীল ছিল একজন একক প্রতিভার ওপর। স্কালোনির আর্জেন্টিনা ভিন্ন। এখানে মেসি সূর্য হলেও অন্য তারকারাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দলের কাঠামো এমনভাবে সাজানো, যাতে মেসির প্রতিভা পুরো দলকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে। এর প্রতিফলন দেখা গেছে শেষ দুই বিশ্বকাপে। মেসির ঝুলিতে এসেছে ১৫ গোল। কিন্তু পরিসংখ্যানের বাইরেও সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এখন আর তাকে একাই আর্জেন্টিনাকে টানতে হচ্ছে না। সতীর্থরা জানে, কখন মেসির জন্য জায়গা তৈরি করতে হবে, কখন তার কাছ থেকে বল নিতে হবে, আবার কখন তার কাঁধের চাপ নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে হবে। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা যখন আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করলো, তখন ম্যাচশেষের উদ্‌যাপনে যেন ফুটে উঠলো এই দলের আসল পরিচয়।

সতীর্থদের কাঁধে চড়ে থাকা মেসির ছবিটি কেবল একটি জয়ের স্মৃতি নয়; এটি একটি দীর্ঘ যাত্রার প্রতীক। যে যাত্রায় সংশয় জায়গা ছেড়েছে বিশ্বাসকে, দূরত্ব জায়গা ছেড়েছে ভালোবাসাকে। পাসারেল্লার মতো কঠোর শাসক নন। ম্যারাডোনার মতো বিস্ফোরক ব্যক্তিত্বও নন। মেসি নিজের জন্য বেছে নিয়েছেন তৃতীয় একটি পথ। নীরব অথচ অটল নেতৃত্বের পথ। ইতিহাস হয়তো একদিন বলবে, আর্জেন্টিনা শুধু একজন সর্বকালের সেরা ফুটবলারই পায়নি; পেয়েছিল এমন একজন অধিনায়ককে, যিনি নেতৃত্বকে ক্ষমতার নয়, বিশ্বাসের শিল্পে পরিণত করেছিলেন।

(স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল পাইস থেকে)

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন