কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম থেকে নিউ ইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়াম-লিওনেল মেসির নেতৃত্বে নামা আর্জেন্টিনার দুই দলের পার্থক্য শুধু সাড়ে তিন বছরের। ঠিক যেখানে বিশ্বকাপ আসর শেষ করেছিল আলবিসেলেস্তেরা, সেখান থেকেই যেন শুরু করেছে তারা। ২০২২ বিশ্বকাপে যাদের ওপর ভরসা করে ৩৬ বছরের আক্ষেপ মিটিয়েছিলেন কোচ লিওনেল স্কালোনি, তাদের ওপর ভর করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে। লিওনেল স্কালোনির জন্য শাপেবর ছিল গত বিশ্বকাপের স্কোয়াড। সেই স্কোয়াডের গড় বয়স ছিল মাত্র ২৭ বছর। এর মধ্যে অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার নিয়ে আসা মেসি, অ্যাঞ্জেলো ডি মারিয়া ও নিকোলাস ওতামেন্দিকে বাদ দিলে স্কোয়াডটা পরিণত হতো তারুণ্যের সমাহারে। ২৬ জনের দলে ৩০-এর কোটা পার করেছিলেন ৭ জন।
এর মধ্যে দু’জন ছিলেন বেঞ্চে বসা গোলরক্ষক। ৩০ পার করা অভিজ্ঞ পাপু গোমেজ, মার্কোস আকুনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছিলেন তরুণ এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো দি পল, হুলিয়ান আলভারেজরা। একেবারে প্রথম দিন থেকেই একাদশের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এসব তরুণ তুর্কিরা। ফলে প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে হোঁচট খেলেও ঠিকই বিশ্বকাপ নিয়েই কাতার থেকে ফিরেছিল আর্জেন্টিনা। আলভারেজ, ফার্নান্দেজদের সঙ্গে মেসি-দি মারিয়ার জুটি মিলে সমাপ্তি টেনেছিল ৩৬ বছরের অপেক্ষার। সাড়ে তিন বছরে স্কালোনির সেই স্কোয়াড বড় হয়েছে, বয়স ও অভিজ্ঞতা দুটোতেই। এসময়ে স্কোয়াডে পরিবর্তন এসেছে মোট ৯টি জায়গায়। কিন্তু বেশির ভাগ পরিবর্তনই এসেছে বেঞ্চে, একাদশের আশপাশে বলার মতো পরিবর্তন এসেছে মাত্র দুটি।
ফুটবলকে বিদায় জানানো দি মারিয়া আর অফ ফর্মের কারণে বাদ পরা পাওলো দিবালা। এই দুজনকে বাদ দিলে দুই বিশ্বকাপের একাদশে পার্থক্য খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর। গত বিশ্বকাপে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালের সঙ্গে যদি এই বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ম্যাচের একাদশ মেলানো হয়, সেখানে পরিবর্তন চোখে পড়বে মাত্র একটি দি মারিয়ার জায়গায় এসেছেন জুলিয়ানো সিমিওনে। চার বছর পর এসেও একই দলের ওপর ভরসা রাখা, সেই দলকে নিয়ে পারফর্ম করা কিন্তু সহজ কথা নয়। স্কালোনি সেটাই করে দেখিয়েছেন। তৈরি হওয়া সমস্যার খুঁজেছেন নতুন সমাধান। দি মারিয়া চলে যাওয়ার পর আর্জেন্টিনার বাঁ প্রান্ত অনেকটাই অকার্যকর হয়ে আছে। তাগলিয়াফিকোর সঙ্গে দি মারিয়ার যে রসায়ন ছিল গত বিশ্বকাপে, সেটা তো নেই-ই। সঙ্গে বয়সের কারণে তাগলিয়াফিকোর সেই ধারও নেই। ফলে স্কালোনিকে খেলতে হয়েছে মাঝমাঠ ব্যবহার করে, আক্রমণও সাজাতে হয়েছে সেভাবে। এখানেই দিবালার মতো একজন ক্রিয়েটিভ মিডফিল্ডারকে হয়তো মিস করেছেন তিনি।
কারণ, মাঝমাঠে প্রতিপক্ষের প্রেসিং সয়ে মাঠের ভেতরের ফাঁকা জায়গা ব্যবহার করার মতো একজন খেলোয়াড়ের বড্ড অভাব ছিল দলে। চার বছরে শাণিত হওয়া এনজো ফার্নান্দেজকে এই জায়গাতে ব্যবহার করেছেন তিনি। ফার্নান্দেজ-দি পল-ম্যাক আলিস্টার ভূমিকা পাল্টালেও নিজেদের কাজ তাঁরা ঠিকঠাক করে যাচ্ছেন। মাঝমাঠে নতুন সংযোজন হিসেবে দলে এসেছেন জুলিয়ানো সিমিওনে, নিকো গঞ্জালেজ, নিকো পাজের মতো তরুণ তারকা। কিন্তু গত বিশ্বকাপে যেভাবে তরুণদের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রেখেছিলেন, সেভাবে এবার কারও ওপর ভরসা রাখতে পারছেন না। একেবারে দেয়ালে পিঠ ঠেকে না গেলে মাঠে নামাচ্ছেন না কাউকেই।
ফলে দলের খুঁতগুলো সহজেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচ বাদে প্রতিটি ম্যাচেই গোল হজম করতে হয়েছে আর্জেন্টিনাকে। কেপ ভার্দে বাদে প্রতিটি নকআউট পর্বের ম্যাচই জিততে হয়েছে পিছিয়ে পড়ার পর। অভিজ্ঞতা আর চাপ সামলানোর অসাধারণ ক্ষমতার ওপর ভর করেই ফাইনাল পর্যন্ত এসেছে স্কালোনির দল। এবার দেখার পালা মেটলাইফের ফাইনাল কি লুসাইলের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারবেন আর্জেন্টিনা।
