বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডকে হারানোর উচ্ছ্বাসের মধ্যেই মাঠে হঠাৎ ভেসে ওঠে একটি কাপড়ের টুকরা, যাতে বড় হরফে লেখা-‘ফকল্যান্ডস (মালভিনাস) আর্জেন্টিনার’। মুহূর্তেই সেই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। আর নতুন করে আলোচনায় চলে আসে দক্ষিণ আটলান্টিকের বহু পুরোনো এক বিরোধ। গত বুধবার আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে জয়ের পরপরই গোলপোস্টের কাছে পড়ে থাকা কাপড়টি চোখে পড়ে মিডফিল্ডার জিওভানি লো সেলসোর। কৌতূহলবশত সেটি তুলে ভাঁজ খুলতেই দেখা যায় লেখাটি। সঙ্গীদের নিয়ে তিনি সেটি মেলে ধরেন গ্যালারির সামনে, আর তাতে যোগ দেন ক্রিস্টিয়ান রোমেরোসহ আরও কয়েকজন খেলোয়াড়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে ম্যাচের আগেই স্টেডিয়ামে বিতর্কিত কোনো পতাকা বা প্ল্যাকার্ড আনার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। সেই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে একদল আর্জেন্টাইন সমর্থক পরিকল্পিতভাবে কাজটি সেরেছেন বলে জানা যাচ্ছে। একটি হোটেল কক্ষের বিছানার চাদর কেটে, তাতে স্প্রে রং দিয়ে হাতে লেখা হয় বার্তাটি। এরপর স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা বলয় ফাঁকি দিয়ে তারা ভেতরে ঢোকেন। খেলা শেষ হতে তখন মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। ঠিক তখনই এক নিরাপত্তাকর্মীর নজরে পড়ে যান তারা। পুলিশ ডাকার হুমকি পেয়ে ব্যানারটি মাঠের দিকে ছুড়ে দিয়ে দ্রুত সটকে পড়েন সমর্থকেরা। খেলা শেষের সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে কাপড়টি গিয়ে পড়ে পেনাল্টি বক্সের কাছাকাছি জায়গায়। আর সেখান থেকেই সেটি হাতে তুলে নেন লো সেলসো। উদ্যাপন শেষে গ্যালারি থেকে কেউ কেউ স্মারকটি নিজের কাছে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে দল ও কর্মকর্তারা বিষয়টি সামলে নেন।
আর্জেন্টিনা দলের এক কর্মী পাত্রিসিও আউবের সযত্নে ব্যানারটি সংগ্রহ করে ড্রেসিংরুমে নিয়ে যান। পরে নিজের ইনস্টাগ্রামে সেই ব্যানারের ছবি পোস্টে লিখেন, ‘যার জন্য প্রযোজ্য, এটি ভালো হাতেই আছে।’ আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যম লা নাসিওন জানিয়েছে, কাপড়ের টুকরাটি এখনো দলের কাছেই সংরক্ষিত আছে। স্পেনের বিপক্ষে ফাইনালেও এটি মাঠে ফিরতে পারে। এরপর হয়তো এটির ঠাঁই হবে আর্জেন্টিনা ফুটবল এসোসিয়েশনের জাদুঘরে, বিশ্বকাপের অন্যান্য স্মারকের পাশে। ঘটনার পরপরই নড়েচড়ে বসে ফিফা। নিষিদ্ধ বার্তা মাঠে প্রদর্শনের ঘটনায় তদন্তে নেমেছে সংস্থাটি। ফকল্যান্ডস। যা স্প্যানিশ ভাষায় পরিচিত মালভিনাস নামে। দক্ষিণ আটলান্টিকে আর্জেন্টিনার উপকূল থেকে প্রায় পাঁচশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একগুচ্ছ দ্বীপ। অষ্টাদশ শতকে ফ্রান্স ও বৃটেন প্রায় একই সময়ে সেখানে বসতি স্থাপন করে, পরে ফরাসিরা তাদের অধিকার স্পেনের কাছে হস্তান্তর করে। ঊনবিংশ শতকে স্পেন থেকে স্বাধীনতা লাভের পর আর্জেন্টিনা এই দ্বীপপুঞ্জের ওপর দাবি জানায়, কিন্তু ১৮৩৩ সালে বৃটিশ বাহিনী সেখান থেকে আর্জেন্টাইন উপস্থিতি হঁটিয়ে দ্বীপগুলো নিজেদের করে নেয়।
এই বিরোধ চরমে পৌঁছায় ১৯৮২ সালে, যখন আর্জেন্টিনার তৎকালীন সামরিক জান্তা দ্বীপপুঞ্জ দখলের চেষ্টা করে। প্রায় দুই মাসের যুদ্ধে বৃটেন জয়ী হয়, আর সেই পরাজয়ের অভিঘাতেই আর্জেন্টিনায় সামরিক শাসনের পতন ঘটে এবং গণতন্ত্র ফিরে আসে। তবে সার্বভৌমত্বের দাবি আর্জেন্টিনা আজও ছাড়েনি। ১৯৯৪ সালের সংবিধানেও দ্বীপপুঞ্জকে নিজেদের ভূখণ্ড বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ২০১৩ সালের গণভোটে দ্বীপবাসীদের প্রায় সবাই বৃটেনের সঙ্গে থাকার পক্ষে রায় দেন, যদিও আর্জেন্টিনা সেই ভোটকে বৈধ বলে মানতে নারাজ।
