ফুটবল বিশ্বের শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটের লড়াইয়ে প্রস্তুত আর্জেন্টিনা ও স্পেন। একদিকে লাতিন আমেরিকার চ্যাম্পিয়ন, অন্যদিকে ইউরোপের সেরা। আজ রাতে বিশ্বমঞ্চের মেগা ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে এই দুই পরাশক্তি। মাঠের লড়াই শুরুর আগে খাতা-কলমের হিসাবে কে এগিয়ে? দুই দলের পারফরম্যান্সের এক্স-রে রিপোর্ট বলছে, এটি আসলে হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য আক্রমণভাগের সঙ্গে স্পেনের দুর্ভেদ্য প্রাচীরের এক ধ্রুপদী লড়াই। যেহেতু আর্জেন্টিনা এই টুর্নামেন্টে দুবার অতিরিক্ত সময়ে খেলেছে, তাই স্বাভাবিকভাবেই তারা স্পেনের চেয়ে ৬০ মিনিট বেশি মাঠে কাটিয়েছে। পরিসংখ্যানের সমতা আনতে তাই বিবিসি এখানে প্রতি ৯০ মিনিটের গড় পারফরম্যান্সকে আমলে নিয়েছে।
আর্জেন্টাইন ফিনিশিংয়ের ধার ও দূরপাল্লার বোমা
চলতি বিশ্বকাপে ১৯ গোল করে তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। এর পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে তাদের নিখুঁত ফিনিশিং। চার বছর আগে সৌদি আরবের কাছে ২-১ গোলে হেরে যাত্রা শুরুর পর, বিগত ১৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচে অন্তত ২টি করে গোল করার অনন্য রেকর্ড ধরে রেখেছে তারা। অন্যদিকে, স্প্যানিশরা বেশি শট নিলেও আর্জেন্টিনার চেয়ে ৬টি গোল কম (১৩টি) করেছে। তাদের এক্সপেক্টেড গোল (এক্সজি) রেটিং ছিল ১৩.৩। অর্থাৎ সুযোগ অনুযায়ী তারা প্রত্যাশিত গোলই পেয়েছে, তার বেশি নয়। তবে বক্সের ভেতর দুই দলই প্রায় সমান বিপজ্জনক হলেও, বক্সের বাইরে থেকে আর্জেন্টিনা যেন একেকটি দূরপাল্লার বোমা ছুড়েছে। বক্সের বাইরে থেকে তারা ৫টি গোল আদায় করলেও, স্পেন এখনো দূরপাল্লার শট থেকে খাতা খুলতে পারেনি।
স্পেনের দুর্ভেদ্য প্রাচীর
আর্জেন্টিনা যেখানে গোল করায় ওস্তাদ, স্পেন সেখানে গোল হজম না করায় রাজা। টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনার চেয়ে ৬ গোল কম খেয়েছে লা রোহারা। কোয়ার্টার ফাইনালে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয় বাদ দিলে, পুরো টুর্নামেন্টে তারা আর কোনো গোলই খায়নি! আর্জেন্টিনা অবশ্য ৭টি গোল হজম করে কিছুটা দুর্ভাগা ভাবতেই পারে। কারণ তাদের রক্ষণে প্রতিপক্ষ শট নেয়ার সুযোগই পেয়েছে কম। তবে আর্জেন্টিনা ভালো করলেও দে লা ফুয়েন্তের স্পেনের রক্ষণ ছিল সম্পূর্ণ অন্য স্তরের। ৪৪টি দলের চেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার পরও স্পেনের রক্ষণভাগের সার্বিক ‘ডিফেন্সিভ এক্সজি’ মাত্র ২.১, যা পুরো টুর্নামেন্টে সর্বনিম্ন। সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিধ্বংসী আক্রমণভাগকেও তারা শ্বাস নেয়ার সুযোগ দেয়নি। গোলপোস্টে প্রতিপক্ষকে কোনো সহজ সুযোগই তৈরি করতে দেয়নি স্প্যানিশ ডিফেন্ডাররা। স্পেনের এই জমাট রক্ষণের মূল রহস্য তাদের কঠোর পরিশ্রম। অতিরিক্ত সময়ের কারণে আর্জেন্টিনা মোটের ওপর সাড়ে ১৩ কিলোমিটার বেশি দৌড়ালেও, প্রতি ৯০ মিনিটের হিসাবে স্পেন অনেক বেশি দৌড়েছে এবং স্প্রিন্ট টেনেছে। প্রতিপক্ষের সীমানায় বল কেড়ে নেয়ার দিক থেকেও তারা টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় সেরা।
বিপরীতে, আর্জেন্টিনা এই বিশ্বকাপে অদ্ভুত এক কৌশলে খেলেছে। প্রতিটি ম্যাচেই তারা প্রতিপক্ষের চেয়ে গড়ে কম দৌড়েছে (সব মিলিয়ে ১৭ কিলোমিটার কম)। তবে কম দৌড়ালেও ঠিকই ম্যাচ বের করে নিয়েছে তারা। জর্ডানের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মূল খেলোয়াড়দের বিশ্রাম দেয়ায় এবং এই কম পরিশ্রমের কৌশলের কারণে, ৬০ মিনিট বেশি খেলার ক্লান্তি ফাইনালে আর্জেন্টিনার ওপর ভর করার সম্ভাবনা কম।
আকাশের রাজা ও ড্রিবলিংয়ের দুই জাদুকর
বলের দখলের ক্ষেত্রে কোনো দলই একক আধিপত্যে বিশ্বাসী নয়। স্পেন সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ৫১% এবং আর্জেন্টিনা আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে ৪৮% বল পজেশন নিয়েও জিতেছে। তবে ক্রসের ক্ষেত্রে আর্জেন্টিনা টুর্নামেন্ট গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ধার বাড়িয়েছে। প্রথম ৪ ম্যাচে মাত্র ১৩টি ক্রস করলেও, শেষ ৩ ম্যাচে তারা ৫১টি ক্রস করেছে। এর একটি থেকে লাউতারো মার্টিনেজ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি পান। তবে শূন্যে ভাসানো বলের (এরিয়াল ডুয়েল) লড়াইয়ে স্পেনের সাফল্যের হার সবচেয়ে বেশি (৬২%)।
দলগতভাবে দুই দলই খুব বেশি ড্রিবলিং করতে পছন্দ করে না। তবে দুই দলের সাধারণ খেলোয়াড়রা ড্রিবলিং না করলেও, দুই দলের দুই মহাতারকা ঠিকই বল পায়ে জাদু দেখাচ্ছেন। দুই দল মিলিয়ে মোট ২০৯ বার ড্রিবলিংয়ের চেষ্টা করেছে, যার ৪৩ শতাংশই (৯০ বার) করেছেন লিওনেল মেসি ও লামিন ইয়ামাল। স্পেনের তরুণ তুর্কি ইয়ামাল (৪৯) টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি ড্রিবলিংয়ের চেষ্টা করেছেন। আর ব্রাজিলের ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের (৪২) পর প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ওপর বল পায়ে চড়াও হওয়ায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন মেসি (৪১)।
