একই রক্ত, ভাষা, সংস্কৃতি। খাবারের টেবিলে বসে আসাদোর ঘ্রাণ কিংবা তোর্তিয়ার স্বাদ নেন তারা। ফ্লামেঙ্কোর তালে যে হৃদয় নাচে ট্যাঙ্গোর ছন্দে তাতে ছেদ ধরিয়ে দিয়েছে বিশ্বকাপের ফাইনাল। কারো কাছে এটা শুধু একটা ফাইনাল নয়, বরং নিজের সঙ্গেই নিজের এক অদ্ভুত লড়াই। দাদুর হৃদয় পড়ে আছে জন্মভূমির মাটিতে, অথচ চোখের সামনে বেড়ে ওঠা নাতি গায়ে জড়িয়েছে অন্য দেশের জার্সি। ঘর ভাগ হয়ে গেছে দুই রঙে। তবে এই বিভাজনে নেই কোনো তিক্ততা, নেই কোনো ক্ষোভ। আছে শুধু ভালোবাসার এক অন্যরকম উদযাপন। যেখানে হারলেও আপন, জিতলেও আপন। নিউ জার্সিতে আজ যখন রেফারির বাঁশি বেজে উঠবে, তখন মাঠের বাইরে লাখো ঘরে বাজবে আরেক নীরব সুর। রক্তের টানে বাঁধা পড়া, তবু দুই ভাগে বিভক্ত হৃদয়ের গল্প। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপের পর প্রথম কোনো অল-স্প্যানিশভাষী দেশের ফাইনাল। সেবার স্বাগতিক উরুগুয়ে আর্জেন্টিনাকে ৪-২ গোলে হারিয়েছিল। এবার আর্জেন্টিনা-সেপন। কাকে সমর্থন করবেন তারা- স্পেনের ‘লা ফুরিয়া’ নাকি আর্জেন্টিনার ‘লা আলবিসেলেস্তে’কে সেই প্রশ্নে বিভক্ত স্প্যানিয়ার্ডরা।
৭৫ বছর বয়সী হুয়ান ম্যানুয়েল পোসাদা। ১৯৬৮ সালে স্পেনের আস্তুরিয়াস থেকে আর্জেন্টিনায় পা রেখেছিলেন। এরপর বুয়েন্স আয়ার্স ৫৮ বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। এত বছর পরও তার মন পড়ে আছে জন্মভূমিতে। বিশ্বকাপের ফাইনাল যেন সেই আবেগকে জাগিয়ে তুলেছে নতুন রূপে। বার্তা সংস্থা এপিকে সেই অনুভূতি জানালেন এভাবে, ‘এটা অনেকটা দুই পাথরের মাঝখানে আটকে পড়ার মতো।’ আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েন্স আয়ার্স প্রতিষ্ঠার নেপথ্যে রয়েছেন একজন স্প্যানিয়ার্ড অভিযাত্রী। পেদ্রো দে মেন্দোজা। যিনি যোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এ শহর প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময় স্পেনের উপনিবেশ ছিল আর্জেন্টিনা। স্প্যানিশ সাম্রাজ্যের কাছ থেকে শাসনমুক্ত হতে চাওয়া আর্জেন্টিনা স্বাধীনতার লড়াই চালিয়ে গেলেও দেশটিতে আইবেরিয়ান উপদ্বীপের সাংস্কৃতিক প্রভাবে ভাটা পড়েনি। উনিশ শতকের শুরুতে আর্জেন্টিনা স্বাধীন হওয়ার পর দেশটিতে স্প্যানিশ অভিবাসীদের আগমনে সেই প্রভাব বরঞ্চ গভীর হয়। স্পেনে জন্ম হওয়া পেসাদাও থাকেন আর্জেন্টিনায়।
একসময় স্প্যানিশ ক্লাব স্পোর্টিং গিহন ক্লাবের সমর্থক ছিলেন তিনি। আর্জেন্টিনায় এসে দল পাল্টে ফেলেছেন। সমর্থন করছেন আর্জেন্টাইন ক্লাব ইন্দিপেনদিয়েন্তে দে আভেয়ানেদাকে। তবুও স্মৃতিকাতর তিনি। পোসেদা বলেন, ‘মনে হয় যেন আমি গতকালই এখানে এসেছি। আমার হৃদয়টা পড়ে আছে স্পেনের আস্তুরিয়াসে, স্পেনের জাতীয় দলের জন্য-এতে কোনো সন্দেহ নেই। স্পেন জিতলে তো দারুণ, কিন্তু আর্জেন্টিনা জিতলেও আমি কষ্ট পাবো না।’ পোসাদা তার আর্জেন্টাইন নাতির সঙ্গে কথোপকথন স্মরণ করে বলেন, ‘সে বলেছিল, দাদু, স্পেন জিতলে আমি স্পেনের জার্সি পরে পতাকা নিয়ে উদযাপন করবো। আর আর্জেন্টিনা জিতলে তোমাকে আমার দেশের জার্সি পরে পতাকা হাতে বের হতে হবে। আমি রাজি হয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমার মনে হয় না স্পেনের জার্সি পরে আমি বুয়েন্স আয়ান্সের ওবেলিস্কের সামনে উদযাপনে বের হতে পারবো!’ (ওবেলিস্ক একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যেখানে আর্জেন্টিনা জিতলে ভক্তরা বিজয়ের উৎসবে মেতে ওঠে)। ম্যানুয়েল ফার্নান্দেজ আচেভেদোর বয়স ৮১ বছর।
অল্প বয়সে স্পেনের ভিগো শহরের বাইওনা পৌরসভা থেকে সপরিবারে আর্জেন্টিনায় পাড়ি জমান। সেখানেই তার মেয়ে ও নাতনির জন্ম। দুই দেশের প্রতি টান অনুভব করা আচেভেদো বলেন, ‘সেরা দলই জিতুক। স্পেন জিতলে ভালো, আর আর্জেন্টিনা জিতলে তাও ভালো।’ সাহিত্য, খাদ্য কিংবা সংগীতের মতোই ফুটবলও দুই দেশের ভ্রাতৃত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আলফ্রেডো ডি স্টেফানো কিংবা লিওনেল মেসি-রিয়াল মাদ্রিদ ও বার্সেলোনার ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকারা তো আর্জেন্টাইনই। তবে এই দুই দেশের মধ্যে চিরাচরিত কোনো ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে ওঠেনি। প্রায় শত বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে তারা মুখোমুখি হয়েছে মাত্র একবার। ১৯৬৬ সালে স্পেনের বিপক্ষে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। সীমান্তের ওপারে থাকা তরুণ প্রজন্মের কাছেও এই ফাইনাল কম আবেগের নয়। ১৯৭৬-৮৩ সালের সামরিক একনায়কতন্ত্র এবং পরবর্তী সময়ে ২০০০ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে হাজার হাজার আর্জেন্টাইন উন্নত জীবনের আশায় স্পেনে পাড়ি জমান।
২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে স্পেনে ৪ লাখ ৫০ হাজার ৮৮৩ জন আর্জেন্টাইন জন্মগ্রহণকারী মানুষ বসবাস করছেন। তাদের কাছেও ফাইনালটি এক বিশেষ উপলক্ষ। মালাগায় এক বছর ধরে বসবাস করা ১৯ বছর বয়সী নাহুয়েল বাররেতা বলেন, ‘আমি তাদের কেবলই একজন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছি, তবে গভীর শ্রদ্ধার সাথে। আমরা জানি আমরা তাদের দেশে আছি এবং শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই ভাই। এখানে নিজের বাড়ির মতোই মনে হয়। বন্ধুদের সাথে শহরের বারের পর্দায় ম্যাচটি দেখবো-এটিই আমাদের নিয়মিত রীতি। এমন বিশ্বকাপ আগে কখনো দেখিনি।’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাইনাল ঘিরে বেশ কিছু হাস্যরসাত্মক ঘটনাও দেখা গেছে। আর্জেন্টিনা-স্পেন দম্পতিরা ম্যাচের আগ পর্যন্ত সাময়িকভাবে আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা হাসিমুখে জানিয়ে দিচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ব্যস্ত সন্তানদের প্রিয় দলের সমর্থক বানানোর চেষ্টায় ব্যস্ত। সবমিলে এবারের বিশ্বকাপ ফাইনাল কেবল একটি ট্রফির লড়াই নয়-এটি দুই সংস্কৃতির মিলনমেলা। যেখানে জয়-পরাজয়ের ঊর্ধ্বে থেকে যায় রক্তের বন্ধন আর ভালোবাসার এক অনন্য নজির।
