বুকে গুলির ক্ষত, শরীরে ২২ ছররা তবুও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন

বুকে গুলির ক্ষত, শরীরে ২২ ছররা তবুও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন

ফন্ট সাইজ:

মনে হয়েছিল আর বাঁচবো না। বুক থেকে রক্ত ঝরছিল, চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিল। তখন শুধু একটাই কথা মনে হচ্ছিল হয়তো আজ শহীদ হয়ে যাবো। কথাগুলো বলতে গিয়ে কিছুক্ষণের জন্য থেমে যান পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার সাতকাছিমিয়া গ্রামের সন্তান মুশফিকুর রহমান আশিক। সেই রক্তাক্ত দিনের স্মৃতি আজও তাকে তাড়া করে ফেরে। শরীরের ভেতরে এখনো বহন করছেন ২২টি ছররা। প্রতিটি ছররা যেন জুলাই আন্দোলনের একেকটি রক্তাক্ত সাক্ষী। আশিক জুলাই আন্দোলনের একজন আহত যোদ্ধা। তিনি জুলাই যোদ্ধাদের বৃহত্তম সংগঠনের স্থায়ী কমিটির সদস্য। তবে তার পরিচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ হলো তিনি সেই তরুণদের একজন যিনি নিজের ভবিষ্যৎ, পড়াশোনা এবং জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখে রাজপথে নেমেছিলেন একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে। আশিক বলেন, তখন আমি এইচএসসি পরীক্ষার্থী।

১লা জুলাই থেকেই আন্দোলনের খবর পাচ্ছিলাম। কিন্তু যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীদের ওপর নির্মম হামলা চালানো হচ্ছে, তাদের রক্তাক্ত মুখ, কান্না আর অসহায় চিৎকার তখন আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। মনে হয়েছিল যদি আজও চুপ থাকি, তাহলে নিজের বিবেকের কাছেই হেরে যাবো। সেই তাড়নায় ১৬ই জুলাই তিনি আন্দোলনে যোগ দেন। রাজধানীর বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতে থাকেন। প্রতিদিনই রাজপথে ছিল অনিশ্চয়তা, ছিল গুলি, টিয়ারশেল, হামলা আর গ্রেপ্তারের ভয়। তবুও পিছু হটেননি। গত ৪ঠা আগস্ট রাজধানীর সায়েন্সল্যাব ও পিলখানার মধ্যবর্তী এলাকায় আন্দোলনে অংশ নেয়ার সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। সেদিনের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে আশিক বলেন, হঠাৎ বুকে গুলি লাগে।

মুহূর্তেই পুরো শরীর রক্তে ভিজে যায়। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। ধীরে ধীরে সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল। তখন মনে হয়েছিল, হয়তো এটাই জীবনের শেষ মুহূর্ত। দীর্ঘ চিকিৎসার পর চিকিৎসকরা তার শরীর থেকে একটি গুলি বের করতে সক্ষম হন। কিন্তু এখনো শরীরের ভেতরে রয়ে গেছে ২২টি ছররা। এগুলো ভবিষ্যতে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে বলে তিনি জানান। আশিক আরও বলেন, আমরা কোনো পদ পদবি কিংবা ব্যক্তিগত লাভের জন্য রাজপথে নামিনি। আমরা চেয়েছিলাম এমন একটি বাংলাদেশ; যেখানে মানুষ বৈষম্যের শিকার হবে না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে কাউকে বুকের রক্ত দিতে হবে না।

তিনি বলেন, অনেক জুলাইযোদ্ধা আজও শরীরে গুলির ক্ষত নিয়ে বেঁচে আছেন। কেউ হাঁটতে পারেন না, কেউ কাজ করতে পারেন না, অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। সরকারের কাছে আমার বিনীত আবেদন আহত জুলাইযোদ্ধাদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হোক। পিরোজপুরের প্রত্যন্ত জনপদ সাতকাছিমিয়ার এই তরুণের শরীরে আজও রয়ে গেছে আন্দোলনের রক্তাক্ত স্মৃতি। কিন্তু তার চোখে এখনো নিভে যায়নি স্বপ্নের আলো। তিনি বিশ্বাস করেন, যাদের রক্তে জুলাইয়ের রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে, সেই আত্মত্যাগ একদিন একটি বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনের পথকে আরও সুদৃঢ় করবে।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন