আফজাল হোসেনের দেশপ্রেম

আফজাল হোসেনের দেশপ্রেম

ফন্ট সাইজ:

অভিনেতা আফজাল হোসেন একজন চিত্রশিল্পী একথা হয়তো তার ভক্তরা সবাই জানে না। তিনি ছবি আঁকেন ইলাস্ট্রেশন করেন, প্রচ্ছদ আঁকেন এমনকি কার্টুনও আঁকেন। তিনি লেখাপড়া করেছেন আর্ট ইন্সটিটিউটে। সেই আফজাল হোসেন ছবি আঁকা, পেশাগত নানা দায়িত্ব পালন করার বাইরেও প্রচুর পরিমাণে দেশ থেকে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ান। কখনো চিকিৎসার জন্য, কখনো লেখাপড়ার জন্য, কখনো বা শুধুই ভ্রমণের জন্য পৃথিবীর বিখ্যাত সব শহরে গিয়েছেন। আফজাল হোসেন খুবই মেধাবী একজন মানুষ। নানা অনুভুতিও ব্যক্ত করেন ভার্চ্যুয়াল জগতে। সবই থাকে দেশ বিষয়ে। নিজের দেশের কোনো অসঙ্গতি দেখলে তিনি পীড়িত হন। কোনো দেশ থেকে ঘুরে এসে যখন বিমানবন্দরে বিশৃঙ্খলা দেখেন তখন খুবই মর্মাহত হন তিনি। কেন আমরা নিয়মের মধ্যে চলতে পারি না। কেন আমরা আইন-শৃঙ্খলা মানি না। এইসব বিষয়ে ভীষণ রকম আহত হন তিনি। তার দেশপ্রেম বর্ণনা করার মতো নয়। ১৯৭১ সালে আফজাল হোসেন ওপার বাংলা চলে গিয়েছিলেন। তখন তিনি টিটু নামে কার্টুন এঁকেছিলেন এবং প্রদর্শনীয় হয়েছিল সেটির। দেশ স্বাধীন হবার পর ফিরে এসে নতুন স্বাধীন দেশে নব উদ্যোমে কাজ শুরু করলেন। তখন মঞ্চনাটক আলোচিত হয়ে উঠেছিল। তিনি অন্যতম একজন হিসেবে কাজ শুরু করলেন মঞ্চনাটকে। তিনি একাধারে অভিনেতা, সেট ডিজাইনার, পোশাক ডিজাইনারও ছিলেন। মনে পড়ে একবার ব্যাংকক থেকে ফিরেই আফজাল হোসেন মন খারাপ করে বসে রইলেন চ্যানেল আইতে।

তাকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে আফজাল?
আফজাল হোসেন আক্ষেপ নিয়ে বলতে লাগলেন- এই যে ব্যাংকক থেকে ঘুরে এলাম ওখানকার নিয়ম-কানুন কত সুন্দর। আমাদের দেশে কেন হয় না এমন? ঢাকায় নেমে সবই এলোমেলো দেখলাম। মানুষজন কোনো শৃঙ্খলা মানে না। যে যার মতো ছোটাছুটি করছে। কারও কোনো বাধা নেই। কেউ কোনো নিয়ম মানে না। লন্ডন, সিডনি, প্যারিস সহ কম দেশ তো ঘুরলাম না। কিন্তু আমাদের দেশের মতো এত অনিয়ম কোথাও চোখে পড়ে না। এগুলো আমাকে খুবই পীড়া দেয়। আফজাল স্বপ্ন দেখে বাংলাদেশও একদিন সুন্দর সমৃদ্ধশালী দেশ হবে। তার এই কাতরতা হওয়া, পীড়িত হওয়াকে আমরা উপলব্ধি করি।
চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে প্রতিবছর আমরা রংতুলিতে মুক্তিযুদ্ধ নামে একটি অনুষ্ঠান করি। দেশের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী সহ তরুণ শিল্পীরা এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন। ছবি আঁকেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। একবার এই অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠানে আফজাল হোসেন সকলের প্রিয় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ সায়ীদ স্যারকে জিজ্ঞেস করেছিলেন- স্যার দেশপ্রেম বলতে কি বোঝায়?

স্যার বললেন, এটা তো একটা দার্শনিকের মতো প্রশ্ন! তবে দেশকে ভালোবাসাটা হচ্ছে নিজের ভূখণ্ডকে ভালোবাসা। নিজের মাটিকে ভালোবাসা। মা’কে ভালোবাসা- এটাই তো দেশপ্রেম। এটা একটা বিমূর্ত ভাবনা। গভীরভাবে ভেবে দেশকে ভালোবাসতে হয়। দেশ হচ্ছে একটা অখণ্ড মাতৃভূমি। যেমন ধন ধান্য পুষ্পভরা কবিতা বা গানটিকে যদি আমরা বাংলার পথে প্রান্তরে যেখানেই বসিয়ে দিই তাহলে দেখা যাবে একইরকম ছবি। গানে যা বলা হচ্ছে বাংলার পথে প্রান্তরে আমরা সেই ছবি খুঁজে পাই। তখন এই বাংলাই হয়ে ওঠে আমাদের চোখে মাতৃভূমি এবং স্বদেশপ্রেম। স্যার আরও কথা বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু টেলিভিশন অনুষ্ঠান তাই তাকে থামতে হলো। কিন্তু অসাধারণ ছিল সেই আলোচনা। ভার্চ্যুয়াল জগতে যারা আফজাল হোসেনের কলাম পড়েন তারা জানেন তিনি একজন দেশপ্রেমী মানুষ। তিনি যেকোনো অসংলগ্নতায় ভীষণ কষ্ট পান। এটা তার একটা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সমসাময়িক অনেক বিষয় নিয়ে তিনি লেখেন। দেশের মানুষের অসততা, নীতিবোধের অভাবে তিনি কষ্ট পান। তার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। তবে তিনি স্বপ্ন দেখেন একদিন এগুলো বাংলাদেশে থাকবে না। বাংলাদেশ একটি উন্নত সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে প্রবেশ করবে। মানুষের ভেতর কোনো হানাহানি থাকবে না।

বাংলাদেশ একদিন ঠিকই সুখী সমৃদ্ধশালী দেশ হিসেবে বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্ম হয়েছিল ১৯৬৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর। প্রতিবছর আমরা এই দিনটিকে উদ্‌যাপন করি চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। এই অনুষ্ঠানটিও উপস্থাপনা করেন আফজাল হোসেন। টেলিভিশন সংশ্লিষ্ট শিল্পী, সাহিত্যিক, প্রযোজক, ক্যামেরাম্যান, সেট ডিজাইনার সহ কলাকুশলীর উপস্থিতি ঘটে শীতের সকালে। একদিকে পিঠাপুলির উৎসব চলতে থাকে আরেকদিকে মঞ্চে স্মৃতিকথা, আলোচনা সংগীত। টেলিভিশন কীভাবে বাংলাদেশ গড়ে ওঠার পেছনে ভূমিকা রেখেছে সেগুলোও উঠে আসে এইসব আলোচনায়। আফজাল হোসেন বলেন- আমাদের সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ টেলিভিশন। টেলিভিশনের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না। ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত টেলিভিশন আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিরাট ভূমিকা রাখে। নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, খায়রুল আলম সবুজ, আল মনসুর এসব বীর মুক্তিযোদ্ধা শিল্পীরা টেলিভিশনে যোগ দিলে আরও সমৃদ্ধ হয় টেলিভিশন। এইসব কথাই বারবার ঘুরেফিরে আসে। অনেক গুণী মানুষের পদভারে সমৃদ্ধ হয় চ্যানেল আইয়ের চেতনা চত্বর। আফজালকে একবার প্রশ্ন করেছিলাম, এই দু’টি লাইভ অনুষ্ঠানের বাইরে আর কোনো অনুষ্ঠান করো না কেন?

তিনি জবাব দিলেন, এই অনুষ্ঠানে দেশপ্রেম আছে। আমি দেশের কথা বলতে খুব ভালোবাসি। একদিন আমাদের দেশও স্বপ্নের মতো হবে। এই অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করে আমি আনন্দ পাই। অনুষ্ঠান দু’টির মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশপ্রেমকে প্রকাশ করতে পারি। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হলে প্রকৃত দেশপ্রেমিককে কাজ করতে হবে। কারণ আমরা আমাদের দেশকে খুব ভালোবাসি। তবে আমরা যে যাই করি না কেন, সবার চিন্তা ও মননে থাকবে বাংলাদেশ। আফজাল হোসেনের আজ জন্মদিন। বয়স কত হলো এটা বলবো না। তবে আমাদের কাছে তিনি নায়ক হয়েই থাকবেন।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন