বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে সমন্বিত মানবসম্পদ নীতিমালা এখন সময়ের দাবি

বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতে সমন্বিত মানবসম্পদ নীতিমালা এখন সময়ের দাবি

ফন্ট সাইজ:

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল ও ক্লিনিক আজ একটি অপরিহার্য স্তম্ভ। দেশের কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছেন। সরকারি হাসপাতালের ওপর চাপ কমানো, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার, বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রদান এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এই খাতে বর্তমানে হাজার হাজার চিকিৎসক, মেডিকেল শিক্ষক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিরলসভাবে কাজ করছেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, দেশের অধিকাংশ বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এখনো একটি অভিন্ন, আধুনিক ও বাধ্যতামূলক মানবসম্পদ (Human Resource) নীতিমালা নেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চাকরির অনিশ্চয়তা, বেতন বৈষম্য, লিখিত নিয়োগপত্রের অভাব, অনিয়ন্ত্রিত কর্মঘণ্টা, পদোন্নতির অস্পষ্টতা, সামাজিক নিরাপত্তার ঘাটতি এবং পেশাগত মর্যাদাহানির মতো সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করেছে।

সম্প্রতি নবীন চিকিৎসকদের জন্য ন্যূনতম বেতন কাঠামো নির্ধারণে সরকারের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এই উদ্যোগ চিকিৎসকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে বাস্তবতা হলো, শুধু নবীন চিকিৎসকদের জন্য একটি বেতন কাঠামো নির্ধারণ করলেই বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার সমাধান হবে না।

বরং সময়ের দাবি হলো বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সকল চিকিৎসক, শিক্ষক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর জন্য একটি সমন্বিত, টেকসই এবং আইনি ভিত্তিসম্পন্ন জাতীয় বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত মানবসম্পদ নীতিমালা প্রণয়ন করা।

এই নীতিমালার আওতায় প্রথমেই প্রত্যেক কর্মীকে যোগদানের দিন থেকেই লিখিত নিয়োগপত্র প্রদান বাধ্যতামূলক করতে হবে। সেখানে বেতন, কর্মঘণ্টা, ছুটি, পদোন্নতি, ইনক্রিমেন্ট, চাকরি সমাপ্তির শর্ত এবং অন্যান্য সুবিধা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।

একই সঙ্গে চিকিৎসক, শিক্ষক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য জাতীয় মানসম্পন্ন বেতন কাঠামো প্রণয়ন জরুরি। সরকারি পে-স্কেলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম মূল বেতন নির্ধারণ, বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট সময় পর বেতন পুনর্বিবেচনা এবং প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা অনুযায়ী স্তরভিত্তিক (Tier-based) বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
কারণ রাজধানীর একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল, একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা শহরের হাসপাতাল এবং উপজেলা পর্যায়ের ক্লিনিকের আর্থিক সক্ষমতা এক নয়। তাই বাস্তবতা বিবেচনায় একই নীতিমালার আওতায় স্তরভিত্তিক বেতন কাঠামো অধিক কার্যকর ও বাস্তবসম্মত হবে।

যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, উচ্চতর ডিগ্রি, গবেষণা, প্রকাশনা, প্রশিক্ষণ এবং কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ পদোন্নতি নীতিমালা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা নিয়মিত কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, অতিরিক্ত দায়িত্বের জন্য ওভারটাইম ভাতা বা ক্ষতিপূরণমূলক ছুটি প্রদান এবং অন-কল, নাইট শিফট ও সরকারি ছুটিতে কাজের জন্য পৃথক সম্মানী নির্ধারণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে সম্পৃক্ত পেশাজীবীদের জন্য বার্ষিক ছুটি, অসুস্থতাজনিত ছুটি, মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, শোক ছুটি, অধ্যয়ন ও প্রশিক্ষণ ছুটি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ভাতা, দুটি উৎসব বোনাস, বাংলা নববর্ষ ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, গ্র্যাচুইটি, স্বাস্থ্যবীমা এবং গ্রুপ লাইফ ইনস্যুরেন্সের মতো সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা বাধ্যতামূলক করা উচিত।

বিশেষ করে আইসিইউ, সিসিইউ, ক্যাথ ল্যাব, জরুরি এবং অপারেশন থিয়েটারে মতো উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বিভাগে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ঝুঁকি ভাতা এবং কর্মদক্ষতাভিত্তিক ইনসেনটিভ চালু করা সময়ের দাবি।

বর্তমান সময়ে কর্মস্থলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর হামলা, ভীতি প্রদর্শন এবং হয়রানির ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অভিযোগ নিষ্পত্তি কমিটি এবং সহিংসতার বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন করা জরুরি।

একই সঙ্গে নিয়মিত Continuing Medical Education (CME), Continuing Professional Development (CPD), সেমিনার, কর্মশালা, গবেষণা সহায়তা এবং দেশ-বিদেশে প্রশিক্ষণ ও ফেলোশিপে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এতে চিকিৎসার মান যেমন উন্নত হবে, তেমনি দক্ষ জনবল দেশেই ধরে রাখা সম্ভব হবে।

বেসরকারি মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের নিয়োগ, পদোন্নতি এবং একাডেমিক সুযোগ-সুবিধাও সরকারি মেডিকেল কলেজের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। পাশাপাশি প্রতি বছর স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের মাধ্যমে ইনক্রিমেন্ট, পদোন্নতি ও প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
নারী স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ গড়ে তোলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি, দুগ্ধদান কক্ষ, নিরাপদ নাইট শিফট, যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী শিশু পরিচর্যা সহায়তার ব্যবস্থা আধুনিক মানবসম্পদ নীতিমালার অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই নীতিমালা যেন শুধুমাত্র সুপারিশ হিসেবে সীমাবদ্ধ না থাকে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে এটি আইনি ভিত্তিসম্পন্ন বাধ্যতামূলক নীতিমালায় পরিণত করতে হবে। নিয়মিত পরিদর্শন, অডিট এবং কার্যকর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। নীতিমালা লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই খাতের চিকিৎসক, শিক্ষক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ন্যায্য বেতন, চাকরির নিরাপত্তা, পেশাগত মর্যাদা এবং ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ নিশ্চিত করা শুধু তাদের অধিকার নয়; বরং মানসম্মত, নিরাপদ ও টেকসই স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পূর্বশর্ত।

একটি আধুনিক, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং বাধ্যতামূলক জাতীয় মানবসম্পদ নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত আরও শক্তিশালী হবে, দক্ষ জনবল বিদেশমুখী হওয়া কমবে এবং দেশের মানুষ আরও উন্নত, নিরাপদ ও মানবিক স্বাস্থ্যসেবা লাভ করবেন।

আজ তাই সময়ের দাবি বাংলাদেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যখাতের জন্য একটি সমন্বিত, যুগোপযোগী এবং বাধ্যতামূলক জাতীয় বেসরকারি স্বাস্থ্যখাত মানবসম্পদ নীতিমালা দ্রুত প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন।
লেখক: অধ্যাপক, এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ), এমডি (কার্ডিওলজি), বিভাগীয় প্রধান, কার্ডিওলজি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।

কোন মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যকারী হোন!

মন্তব্য করুন